১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:০২ বুধবার বসন্তকাল
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা থেকে একচুলও নড়েননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর্কটিক অঞ্চলের এই বিশাল ভূখণ্ডটি ‘কিনে নেওয়া’ বা পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছেন, তা নিয়ে সৃষ্ট কূটনৈতিক জটিলতা নিরসনে গতকাল বুধবার ওয়াশিংটনে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি কোনো সুরাহা ছাড়াই শেষ হয়েছে। উল্টো বৈঠকের পর স্পষ্ট হয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মৈত্রীতে বড় ফাটল ধরেছে।

ব্যর্থ কূটনৈতিক আলোচনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কূটনৈতিক মহলের তথ্যমতে, উত্তেজনা প্রশমন এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনে ছুটে গিয়েছিলেন। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মটজফেল্ড বৈঠকে বসেন মার্কিন প্রশাসনের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব—পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে।
দীর্ঘ আলোচনার পরেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, “আমরা অনেক আশা নিয়ে আলোচনায় বসেছিলাম, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারিনি। এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ‘জয়’ বা পুরোপুরি নিজেদের দখলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়।”
ট্রাম্পের যুক্তি: রাশিয়া-চীন জুজু ও জাতীয় নিরাপত্তা
বৈঠকের দিনই হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বিতর্কিত পরিকল্পনার পক্ষে নতুন করে সাফাই গান। তিনি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র সঙ্গে জুড়ে দেন।
ট্রাম্প বলেন, “কৌশলগত কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল সমস্যা হলো, পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়া বা চীন যদি কাল গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চায়, তবে ডেনমার্কের কিছুই করার থাকবে না। তাদের সেই সামরিক সক্ষমতা নেই। কিন্তু আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) সবকিছু করার সক্ষমতা আছে। তাই আমেরিকার সুরক্ষার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকা প্রয়োজন।”
প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, তিনি কেবল সামরিক ঘাঁটি বা সহযোগিতা নয়, বরং দ্বীপটির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব চাইছেন।
গ্রিনল্যান্ডের প্রত্যাখ্যান ও জনমত
যুক্তরাষ্ট্রের এমন আগ্রাসী মনোভাবের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ। গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মটজফেল্ড বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে প্রস্তুত, কিন্তু কোনোভাবেই গ্রিনল্যান্ড কারও ‘সম্পত্তি’ বা কেনাবেচার বস্তু হতে পারে না।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় জনগণের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিষয়ে প্রবল অনাগ্রহ রয়েছে। সম্প্রতি পরিচালিত এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৬ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাতলে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। বাকি সিংহভাগ মানুষ নিজেদের স্বায়ত্তশাসন ও ডেনিশ সম্পর্কের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।
আর্কটিক রাজনীতি ও সামরিক সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে নতুন নৌরুট উন্মোচন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে রাশিয়া ও চীন সেখানে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এই ‘গ্রেট গেম’ বা প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে চায় না।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৫০ জন মার্কিন কর্মী কর্মরত। ইউরোপীয় মিত্র হিসেবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করতে রাজি ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি—শুধু উপস্থিতি নয়, চাই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ট্রাম্পের মতে, মালিকানা ছাড়া অন্য কোনো প্রস্তাব তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে ন্যাটো জোটের দুই পুরোনো মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নজিরবিহীন টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখন নির্ভর করছে ডেনমার্কের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর। Analysis | Habibur Rahman
