.
রাজনীতি

ঢাকায় বিএনপির প্রার্থীদের বিত্তবৈভবের চালচিত্র: আয়ে শীর্ষে মির্জা আব্বাস, নগদ অর্থে এগিয়ে সালাউদ্দিন

Email :48

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৪৫ সোমবার বসন্তকাল

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা মহানগর ও জেলার ২০টি আসনে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা থেকে বেরিয়ে এসেছে তাদের আর্থিক ও পেশাগত অবস্থার চমকপ্রদ তথ্য। বিএনপির ১৯ জন প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বার্ষিক উপার্জনের দিক থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সবার শীর্ষে থাকলেও, হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণে সবাইকে টেক্কা দিয়েছেন ঢাকা-১৯ আসনের প্রার্থী দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। অন্যদিকে, সামগ্রিক অস্থাবর সম্পদের হিসেবে সবচেয়ে ধনী প্রার্থী তমিজ উদ্দিন।

আয়ের খতিয়ান: আব্বাসের ধারেকাছে নেই কেউ
ঢাকা-৮ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন বিএনপির হেভিওয়েট নেতা মির্জা আব্বাস। হলফনামার তথ্যমতে, তার বার্ষিক আয় ৯ কোটি ২৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, যা ঢাকার অন্য যেকোনো বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে ঢের বেশি। আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়রের ছেলে ও ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী ইশরাক হোসেন। তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ২৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

বার্ষিক ৫০ লাখ টাকার বেশি আয় করেন এমন তালিকায় আরও রয়েছেন ঢাকা-২ আসনের আমানউল্লাহ আমান (৫১ লাখ ৭১ হাজার টাকা) এবং ঢাকা-২০ আসনের তমিজ উদ্দিন (৫৩ লাখ ৬ হাজার টাকা)। তবে সবচেয়ে কম আয়ের প্রার্থী হলেন ঢাকা-১৪ আসনের সানজিদা ইসলাম। ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের এই সমন্বয়ক বছরে আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

নগদ টাকা ও ব্যাংক আমানত
উপার্জনে মির্জা আব্বাস এগিয়ে থাকলেও, হাতে নগদ টাকা রাখার ক্ষেত্রে সবার ওপরে আছেন সাভারের (ঢাকা-১৯) প্রার্থী দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তার হাতে নগদ ৩ কোটি ২০ লাখ ২৮ হাজার টাকা রয়েছে। মির্জা আব্বাসের হাতে রয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

কোটি টাকার ওপরে নগদ অর্থ আছে আরও চার প্রার্থীর হাতে। তারা হলেন—ববি হাজ্জাজ (১ কোটি ৫৬ লাখ), তমিজ উদ্দিন (১ কোটি ৪৮ লাখ), হামিদুর রহমান (১ কোটি ১৩ লাখ) এবং হাবিবুর রশীদ (১ কোটি ৩ লাখ টাকা)। তবে ঢাকা-১৫ আসনের শফিকুল ইসলাম খানের হাতে নগদ অর্থ মাত্র ৩০ হাজার ২৫৭ টাকা।

ব্যাংকে টাকা জমানোর দিক থেকে এগিয়ে তরুণ নেতা ইশরাক হোসেন (১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা)। এরপরই আছেন ফুটবলার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া আমিনুল হক (১ কোটি ১৮ লাখ টাকা)।

সম্পদ কার কত?
নগদ টাকা ও ব্যাংক স্থিতি মিলিয়ে অস্থাবর সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ঢাকা-২০ আসনের তমিজ উদ্দিন। তার মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। এই তালিকায় ৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকার সম্পদ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন মির্জা আব্বাস। সবচেয়ে কম অস্থাবর সম্পদ নবী উল্লাহর (৩৮ লাখ টাকা)।

অন্যদিকে, স্থাবর সম্পত্তির (জমি, বাড়ি ইত্যাদি) হিসেবে ঢাকা-৭ আসনের হামিদুর রহমানের সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য চমকে দেওয়ার মতো। তার ১০ কোটি ৪১ লাখ টাকায় অর্জিত সম্পত্তির বর্তমান মূল্য প্রায় ৪৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন এম এ কাইয়ুম (৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা)।

পেশা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা
ঢাকার ১৯টি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে সিংহভাগই ব্যবসায়ী। ১৫ জন প্রার্থী নিজেদের পেশা হিসেবে ‘ব্যবসা’ উল্লেখ করেছেন। ব্যতিক্রম কেবল চারজন।

  • রাজনীতি: একমাত্র পেশাদার রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
  • কৃষি: ঢাকা-৩ আসনের গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পেশা হিসেবে কৃষিকাজের কথা উল্লেখ করেছেন।
  • শিক্ষকতা ও ব্যবসা: ঢাকা-১৩ আসনের ববি হাজ্জাজ ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন।
  • গৃহিণী: একমাত্র নারী প্রার্থী সানজিদা ইসলাম নিজেকে গৃহিণী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতায় সবার চেয়ে এগিয়ে এম এ কাইয়ুম, যিনি পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ৬ জন প্রার্থী স্নাতকোত্তর পাস। অন্যদিকে নবী উল্লা ‘স্বশিক্ষিত’ এবং শফিকুল ইসলাম খান অষ্টম শ্রেণি পাস বলে উল্লেখ করেছেন।

স্বামীদের চেয়ে ধনী স্ত্রীরা
প্রার্থীদের স্ত্রীদের বিত্তবৈভবও বেশ নজরকাড়া। আমানউল্লাহ আমানের চেয়ে তার স্ত্রী সাবেরা আমানের হাতে নগদ টাকা অনেক বেশি (৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা)। এছাড়া সম্পদের দিক থেকে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস বেশ প্রভাবশালী। মহিলা দলের এই সভাপতির নামে ৩৩ কোটি ১৪ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।

স্বর্ণালংকারের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে ববি হাজ্জাজ ও তার স্ত্রী। ববি হাজ্জাজের নিজের ৩৫ ভরি এবং তার স্ত্রী রাশনা ইমামের কাছে ১২০ ভরি স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু রয়েছে।

অসম্পূর্ণ তথ্য
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হলফনামায় ঢাকা-১৯ আসনের দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং ঢাকা-১৩ আসনের ববি হাজ্জাজের তথ্যে ঘাটতি দেখা গেছে। সালাউদ্দিনের হলফনামার কিছু পাতা এবং ববি হাজ্জাজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আয়কর রিটার্নের অংশটি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৯টিতে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। ঢাকা-১২ আসনটি সমঝোতার ভিত্তিতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে প্রবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে প্রার্থিতা, এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ সদস্য পদও বাতিলের ক্ষমতা রাখে নির্বাচন কমিশন।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts