১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি বিকাল ৫:৫৮ সোমবার শরৎকাল
এটি কেবল একটি মৃত্যুদণ্ডের রায় নয়; এটি একটি ক্ষমতার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সমূলে উৎপাটনের এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন, তখন তা কেবল তাদের জীবনের সমাপ্তির পরোয়ানা ছিল না, বরং তাদের অর্জিত সকল সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের মালিকানার এক অমোচনীয় সীলমোহর ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগ একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় কেবল ব্যক্তির নয়, তার অর্জিত ক্ষমতারও।
বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই রায়টি প্রচলিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে গিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, বাজেয়াপ্তকৃত সকল সম্পত্তি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের ক্ষতিপূরণের জন্য ব্যবহার করা হবে। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যেখানে রাষ্ট্র কেবল অপরাধীকে শাস্তি দিয়েই থেমে থাকছে না, বরং অপরাধের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষত নিরাময়ের সরাসরি উদ্যোগ নিচ্ছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন যে, সরকারের ঘোষিত ৩০ লাখ ও ৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের বাইরেও এই সম্পদ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে ব্যয় হবে। এর মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা যেন বলছে, অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ অপরাধীর থাকতে পারে না, তার প্রথম দাবিদার হলো ভুক্তভোগীরা।
তবে এই ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়নের পথটি অত্যন্ত জটিল। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল দুজনেই পলাতক। আইন অনুযায়ী, আত্মসমর্পণ না করলে আপিলের কোনো সুযোগ নেই এবং রায় কার্যকর হবে তাদের গ্রেপ্তারের পর। এই পরিস্থিতিতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশটি আপাতত একটি শক্তিশালী প্রতীকী পদক্ষেপ হয়েই থাকছে। বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক লড়াই শুরু করেছে। এই লড়াইয়ের সফলতার ওপরই নির্ভর করছে রায়টি কি কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে, নাকি বাস্তবে রূপ নেবে।
ট্রাইব্যুনাল যে পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে এই রায় দিয়েছেন, তা ছিল শিউরে ওঠার মতো। গণভবন থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য, আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার-ড্রোনের মতো সামরিক শক্তির ব্যবহার, এবং ঢাকা ও রংপুরে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যার মতো অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে। এই রায় যেন সেই সব নৃশংসতার এক আনুষ্ঠানিক বিচারিক দলিল।
এই রায় একদিকে যেমন শহীদ পরিবারগুলোর জন্য এক ধরনের মানসিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে, যা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যেও প্রতিফলিত, অন্যদিকে শেখ হাসিনা একে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সব মিলিয়ে, এই রায় কেবল একটি আইনি উপসংহার নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের নতুন সূচনাও বটে। এখন পুরো জাতির অপেক্ষা, এই বিচার কি তার চূড়ান্ত ঠিকানায় পৌঁছাতে পারবে?
Analysis | Habibur Rahman


