১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:১২ বুধবার বসন্তকাল
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন এক অভূতপূর্ব নৈতিক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং অভিভাবক সংস্থার স্বচ্ছতা—দুটোই গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গভীর রাতে একজন কর্মকর্তার বেলকনি টপকে নারী খেলোয়াড়ের কক্ষে প্রবেশের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার পাশাপাশি, খোদ বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আসরে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্নটি উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ভূমিকা নিয়ে—সবকিছু জেনেও কেন তারা অভিযুক্তদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে? এই ঘটনায় ক্রীড়াঙ্গনের অন্ধকার জগৎ যেন এক লহমায় উন্মোচিত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় একজন নারী খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের এক ভয়ংকর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। জানা যায়, মঞ্জুর নামের একজন কর্মকর্তা গভীর রাতে এক নারী খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত কক্ষে বেলকনি টপকে প্রবেশ করেন, যা শুধুমাত্র ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহারই নয়, বরং একজন খেলোয়াড়ের মানসিক নিরাপত্তাকেও ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার সামিল। এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো মাস্তানি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চেও যৌন হয়রানির অভিযোগ সামনে আসে। দলের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা নারী খেলোয়াড়দের কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন। “পিরিয়ডের পর যখন ডাকবো, চলে আসিস! আমার দিকটাও তো দেখতে হবে!”—এই ধরনের বিকৃত মানসিকতার মন্তব্য খেলোয়াড়দের কতটা অসহায় করে তুলতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এটি কেবল হয়রানি নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভে খেলোয়াড়দের বস্তু হিসেবে গণ্য করার এক জঘন্য উদাহরণ।
কিন্তু এই সমস্ত অভিযোগকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা। অভিযোগ রয়েছে, বোর্ড কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। তা সত্ত্বেও কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তারা পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কেন এই নীরবতা? বোর্ডের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে, নাকি প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বাঁচাতে? কারণ যা-ই হোক না কেন, অভিভাবক হিসেবে বিসিবির এই ব্যর্থতা খেলোয়াড়দের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন একটি দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে তাকে আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন ন্যায়বিচারের আশা করা বৃথা। এটি তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে একটি ভয়ংকর বার্তা পৌঁছে দেয় যে, তাদের সম্মান ও নিরাপত্তার কোনো মূল্য নেই এবং অভিযোগ করে কোনো লাভ হবে না।
এই ঘটনাগুলো নিছক কোনো فردی অপরাধ নয়, বরং ক্রীড়া জগতের গভীরে বাসা বাঁধা এক সিন্ডিকেটের অংশ কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিবেককে নাড়া দেওয়া ঘটনাগুলোর পর বিসিবি কি তার ঘুম ভাঙবে? অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি কোনো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, নাকি ক্ষমতা আর খ্যাতির আড়ালে আরও একবার চাপা পড়ে যাবে নারী খেলোয়াড়দের সম্মান আর আর্তি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভবিষ্যৎ।
Analysis | Habibur Rahman


