১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি সকাল ১১:৫১ সোমবার শরৎকাল
মেহেরপুরের রাজনগর গ্রামের মসুরিভাজা বিলের শান্ত জল আজ কেবলই এক নীরব সাক্ষী। যে বিলের বুকে ফুটে থাকা শাপলা শিশুদের কাছে ছিল純粹 আনন্দের উৎস, সেই বিলের সৌন্দর্যই একটি পরিবারের জন্য বয়ে আনল এক অকল্পনীয় ট্র্যাজেডি। একটি হাসিখুশি বিকেল মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিণত হলো এক অন্তহীন শোকে, যেখানে চারটি তাজা প্রাণ বিলের গভীরে হারিয়ে গেল চিরতরে।
রবিবারের বিকেলটা অন্য সব দিনের মতোই ছিল। দুই ভাই মজিবর রহমান ও শাহারুল ইসলামের চার কন্যা—ফাতেমা, মিম, আফিয়া ও আলসিয়া—একসাথে খেলতে খেলতেই শাপলা তোলার আবদার ধরেছিল। চাচাতো বোনদের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল পুরো গ্রামের জন্য এক মিষ্টি দৃশ্য। তাদের সেই আবদার মেটাতেই বাড়ির পাশের বিলে যাওয়া। কে জানত, এই যাওয়াই তাদের শেষ যাওয়া হবে?
সময় গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, তখনও মেয়েদের কোলাহল বাড়িতে না পৌঁছানোয় পরিবারের মনে শঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করে। প্রথমে সামান্য উদ্বেগ, তারপর তা তীব্র আশঙ্কায় রূপ নেয়। বাবা-চাচা আর প্রতিবেশীরা মিলে যখন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন, তখন তাদের প্রার্থনায় ছিল শুধু একটাই—মেয়েরা যেন নিরাপদে থাকে।
কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। কিছু সময় পর, বিলের শান্ত জলের উপর একে একে ভেসে ওঠে চারটি নিথর দেহ। যে শাপলাগুলো হয়তো তারা আনন্দের সাথে সংগ্রহ করেছিল, সেগুলোই যেন তাদের বিদায়ের সাক্ষী হয়ে ভাসছিল পাশে। গ্রামের বাতাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে বুকফাটা আর্তনাদে। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও হয়তো রাতের খাবারের প্রস্তুতি চলছিল, সেই বাড়ি পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে।
মেহেরপুর ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ এসে আনুষ্ঠানিকতা সারে, কিন্তু যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা আর পূরণ হওয়ার নয়। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের গ্রামীণ বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র, যেখানে জলাশয়ের সৌন্দর্য আর তার গভীরে লুকিয়ে থাকা বিপদের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা নেই।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এমন আরও কতগুলো বিকেল কেড়ে নেওয়ার পর আমাদের টনক নড়বে? সাঁতার না জানা এবং জলাশয়ের বিপদ সম্পর্কে অসচেতনতা যে এক “নীরব মহামারী”র মতো আমাদের শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, এই সত্যটি রাজনগরের আকাশ-বাতাস আজ আবারও মনে করিয়ে দিয়ে গেল। আজ মসুরিভাজা বিলের পানি হয়তো শান্ত, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে আছে এক পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। Analysis | Habibur Rahman


