.
বাংলাদেশ

লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা: ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালের সেই কালো অধ্যায়ের আদ্যোপান্ত | 28 October 2006 Bangladesh

Email :50

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৪২ বৃহস্পতিবার শীতকাল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে কিছু তারিখ কেবল সংখ্যা নয়, একেকটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তেমনি একটি দিন, যখন গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ছাপিয়ে রাজপথের বিভক্তি পরিণত হয়েছিল এক নারকীয় তাণ্ডবে। সেদিন পল্টনের রাজপথে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করা হয়নি, বরং আঘাত করা হয়েছিল দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূলে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ছিল ক্ষমতার পালাবদলের এক জটিল সন্ধিক্ষণ। চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছিলেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন— এই প্রশ্নে গোটা দেশ ছিল উত্তপ্ত। ঠিক এমন এক মুহূর্তে, যখন রাজনৈতিক বিতর্কের সমাধান হওয়ার কথা ছিল আলোচনার টেবিলে, তখন তার মীমাংসা করার চেষ্টা হলো লগি-বৈঠা আর অস্ত্রের ভাষায়।

রাজধানীর পল্টন-বায়তুল মোকাররম এলাকায় সেদিন যা ঘটেছিল, তা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সংঘাত ছিল না। এটি ছিল এক অসম শক্তির পাশবিক প্রদর্শনী, যেখানে একটি পক্ষের ওপর চালানো হয়েছিল পরিকল্পিত ও নৃশংস হামলা। আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাতে থাকা লগি-বৈঠা সেদিন আর সাধারণ কোনো বস্তু ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার এক ভয়ংকর প্রতীকে। ক্যামেরার লেন্সের সামনেই পিটিয়ে হত্যা করা হয় জামায়াত-শিবিরের অন্তত ছয়জন নেতা-কর্মীকে। এই দৃশ্য কেবল প্রতিপক্ষের মনেই নয়, সাধারণ মানুষের মনেও এক দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল।

জামায়াত-বিএনপি জোটের পক্ষ থেকে এটিকে বরাবরই একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে একটি অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা। তাদের মতে, এটি ছিল ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী মনোভাবের এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনার পর শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলও সেদিনকার এই বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে, ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অবিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল, তার প্রভাব আজও দৃশ্যমান। সেই দিনের রক্ত শুধু রাজপথকে রঞ্জিত করেনি, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গভীরে এমন এক বিভাজন তৈরি করেছে, যা আজও শুকায়নি। এটি সেই কলঙ্কিত অধ্যায়, যা স্মরণ করিয়ে দেয়—রাজনৈতিক মতপার্থক্য যখন প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষের জীবন দিয়ে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts