১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি সকাল ১১:৫২ সোমবার শরৎকাল
নারা’র আদালতে সেদিন ছিল পিনপতন নীরবতা। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তেতসুইয়া ইয়ামাগামির দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা জাপান। কেবল দুটি শব্দেই তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিলেন— “সবকিছুই সত্যি”। এই ছোট্ট বাক্যটি কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি ছিল না, বরং এটি ছিল জাপানের রাজনীতি ও সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক ক্ষতের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দেওয়ার মতো।
কিন্তু কী সেই ‘সত্যি’? ইয়ামাগামির এই স্বীকারোক্তির পেছনের গল্পটি কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা ক্ষমতার লড়াইয়ের নয়, বরং এটি এক গভীর ব্যক্তিগত হতাশা এবং প্রতিশোধের কাহিনী। তার ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইউনিফিকেশন চার্চ নামের একটি ধর্মীয় সংগঠন, যার কারণে তার পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছিল। আদালতে তিনি জানান, তার মা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ইয়েন এই চার্চকে দান করে দেওয়ার পর তাদের পরিবার এক চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। ইয়ামাগামির বিশ্বাস ছিল, এই বিতর্কিত সংগঠনের সঙ্গে শিনজো আবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, যা তার ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়।
ইয়ামাগামির এই পদক্ষেপ কেবল একজন ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড ছিল না, এটি ছিল জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে লুকিয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর সম্পর্কের ওপর এক শক্তিশালী আঘাত। আবের মৃত্যুর পর তার দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) শতাধিক এমপির সঙ্গে ইউনিফিকেশন চার্চের সংশ্লিষ্টতার খবর সামনে আসে, যা দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। যে বিষয়টি এতদিন পর্দার আড়ালে ছিল, তা এক হত্যাকাণ্ডের কারণে জাপানের মূল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়।
বর্তমানে ইয়ামাগামির বিরুদ্ধে বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও তিনি এর দায় স্বীকার করেছেন, তার আইনজীবী অস্ত্র আইনের কিছু ধারা নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম এবং জাপানের সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে এই মামলার রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে, যা আগামী জানুয়ারিতে ঘোষণা হওয়ার কথা।
এই মামলাটি তাই এখন আর শুধু একজন হত্যাকারীর বিচার নয়, এটি জাপানের জন্য এক আত্ম-উপলব্ধির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। একটি পরিবারের আর্থিক ধ্বংসযজ্ঞ এবং এক যুবকের প্রতিশোধস্পৃহা কীভাবে একটি দেশের রাজনীতির ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে, তেতসুইয়া ইয়ামাগামির কাহিনী তারই এক মর্মান্তিক দলিল। তার একটি স্বীকারোক্তি জাপানকে এমন এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা থেকে মুখ ফেরানো হয়তো আর সম্ভব নয়।
Analysis | Habibur Rahman


