
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। উন্মুক্ত ঘোষণা দেওয়ার পরও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’কে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী। এতে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কতটা নিরাপদ এই জলপথ, আর কতটা নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ঘোষণা?
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার সন্ধ্যায়। ইরান ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত। এই ঘোষণার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের কাছে নোঙর করা ‘বাংলার জয়যাত্রা’ রাত ৯টার দিকে যাত্রা শুরু করে ফুজাইরা বন্দরের উদ্দেশে।
জাহাজটি অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের মতোই এগিয়ে যাচ্ছিল। রাত ১১টা ৫০ মিনিটে এটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল, এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোরের মধ্যেই প্রণালি পার হয়ে ওমান সাগরে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইরানি নৌবাহিনী রেডিও বার্তার মাধ্যমে সব জাহাজকে থামার নির্দেশ দেয়। জানানো হয়, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। ফলে বাধ্য হয়ে ‘বাংলার জয়যাত্রা’কে যাত্রা থামাতে হয়।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অনুমতি চাওয়ার পর কোনো উত্তর না পাওয়ায় তারা ধরে নিয়েছিলেন প্রণালি উন্মুক্ত। একই সময় প্রায় ৪০টি জাহাজ একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিল, এবং জয়যাত্রাও তাদের অনুসরণ করছিল।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যদি প্রণালি সত্যিই উন্মুক্ত করা হয়ে থাকে, তাহলে কেন মাঝপথে এই বাধা? এটি কি শুধুই নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশল? এর আগেও জাহাজটি দীর্ঘ ৪০ দিন আটকে ছিল। ৩১ জন নাবিক নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এটি হরমুজের কাছাকাছি আটকা পড়ে। পরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলে আবার যাত্রা শুরু করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবারও বাধার মুখে পড়ে।
এই ঘটনাটি শুধু একটি জাহাজের যাত্রা বিঘ্নিত হওয়ার গল্প নয়। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ। এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটি দেশের ঘোষণার ওপর নির্ভর করে জাহাজ চলাচল করা কতটা নিরাপদ—সেটিও নতুন করে ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, ‘বাংলার জয়যাত্রা’র এই থেমে যাওয়া যাত্রা যেন একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—বিশ্ব রাজনীতির খেলায় সমুদ্রপথ কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়।