১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১০–দলীয় নির্বাচনী জোটে আসন ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ৩০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেও বাস্তবে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে দেখা গেছে, এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া চারটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য শরিকদের প্রার্থীরা এখনো নির্বাচনী মাঠে রয়ে গেছেন।
এর ফলে নরসিংদী-২ ও চট্টগ্রাম-৮ সহ মোট চারটি আসনে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ লড়াই কিংবা অন্তর্কোন্দলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এনসিপি জানিয়েছে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিরসনে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
জামায়াত প্রার্থীর ‘অবরুদ্ধ’ নাটক ও নরসিংদী-২ আসন
এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া নরসিংদী-২ (পলাশ ও সদর আংশিক) আসনে বেশ নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন মো. গোলাম সারোয়ার (সারোয়ার তুষার)। কথা ছিল, এখান থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আমজাদ হোসাইন তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন।
কিন্তু মঙ্গলবার (প্রত্যাহারের শেষ দিন) আমজাদ হোসাইন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে তাঁর নিজ দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা তাঁকে বাসায় ‘আটকে’ রাখেন। কর্মীদের ক্ষোভ ও বাধার মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে গিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি। ফলে জোটের সমঝোতা সত্ত্বেও এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী বহাল রইলেন।
চট্টগ্রাম-৮ আসনেও সরেনি জামায়াত
বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও–পাঁচলাইশ নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ আসনটিও এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছিল ১০–দলীয় জোট। এখানে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ। জোটভুক্ত অন্যান্য দলগুলো এখান থেকে সরে দাঁড়ালেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবু নাছের তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান। মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাটে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিষয়টিকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে আখ্যায়িত করেন।
অন্যান্য শরিকেও জট
শুধু জামায়াত নয়, জোটের অন্য শরিকদের সঙ্গেও এনসিপির আসন ভাগাভাগিতে জট পেকেছে। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এনসিপির প্রার্থী এস এম সাইফ মোস্তাফিজ। এই আসনটি এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া হলেও এখানে থেকে গেছেন ১০–দলীয় জোটের শরিক ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’র (এবি পার্টি) প্রার্থী।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির আবদুল্লাহ আল আমিনকে সমর্থন দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। ফলে এই দুই আসনেও এনসিপিকে জোটের শরিকদের বিপক্ষেই লড়তে হচ্ছে।
এনসিপির প্রার্থীরাও প্রত্যাহার করতে পারেননি
জটিলতা শুধু একপক্ষীয় নয়। এনসিপির পক্ষ থেকেও দুটি আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি। শরীয়তপুর-১ ও শেরপুর-১ আসন দুটি জোটের অন্য শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু এনসিপির একজন দায়িত্বশীল নেতা জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থীরা নির্বাচন অফিসে পৌঁছাতে না পারায় বা জটিলতার কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যায়নি।
উন্মুক্ত আসন ও এনসিপির বক্তব্য
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনটি জোটগতভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এখানে এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে থাকছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শেখ নূরে আলম হামিদী।
সার্বিক বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ও দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, “ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে শরিক দলের প্রার্থীরা কেন প্রত্যাহার করেননি, তা নিয়ে আমরা জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আলোচনা করছি। আশা করছি আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে।”
‘শাপলা কলি’ প্রতীকে লড়বেন যারা
এনসিপির প্রার্থীরা এবার ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। দলটির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিচিত মুখেরা। ঢাকা-১১ আসনে লড়বেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন লড়বেন রংপুর-৪ আসন থেকে।
এছাড়া কুমিল্লা-৪ আসনে হাসনাত আবদুল্লাহ, পঞ্চগড়-১ আসনে সারজিস আলম, ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং নোয়াখালী-৬ আসনে আবদুল হান্নান মাসউদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এনসিপির অন্যান্য চূড়ান্ত প্রার্থীরা হলেন:
- ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা: আরিফুল ইসলাম আদীব (ঢাকা-১৮), দিলশানা পারুল (ঢাকা-১৯), নাবিলা তাসনিদ (ঢাকা-২০), জাবেদ রাসিন (ঢাকা-৯), আলী নাছের খান (গাজীপুর-২), মাজেদুল ইসলাম (মুন্সিগঞ্জ-২), আবদুল্লাহ আল আমিন (নারায়ণগঞ্জ-৪)।
- চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল: মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ (চট্টগ্রাম-৮), মাহবুব আলম (লক্ষ্মীপুর-১), আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন (পার্বত্য বান্দরবান), মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), মোহাম্মদ আতাউল্লাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩)।
- উত্তরাঞ্চল ও অন্যান্য: মো. আবদুল আহাদ (দিনাজপুর-৫), আতিক মুজাহিদ (কুড়িগ্রাম-২), জাহিদুল ইসলাম (ময়মনসিংহ-১১), ফাহিম রহমান খান পাঠান (নেত্রকোনা-২), সাইফুল্লাহ হায়দার (টাঙ্গাইল-৩), এস এম জার্জিস কাদির (নাটোর-৩), এস এম সাইফ মোস্তাফিজ (সিরাজগঞ্জ-৬)।
- দক্ষিণাঞ্চল: জামিল হিজাযী (রাজবাড়ী-২), সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া (নোয়াখালী-২), শামীম হামিদী (পিরোজপুর-৩)।
জোটের অভ্যন্তরীণ এই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
Analysis | Habibur Rahman
