১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:৩৬ সোমবার বসন্তকাল
শেরপুরে রাজনৈতিক সহিংসতায় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের পর আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। এ ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে রাজনৈতিক দলগুলো, আর স্থানীয় জনগণের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক ও শোক।

সংঘর্ষের সূত্রপাত: নির্বাচনী অনুষ্ঠানে উত্তেজনা
বুধবার দুপুরে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্টেডিয়ামে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উদ্যোগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে একটি নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও সমর্থকেরা সেখানে উপস্থিত হতে থাকেন।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই সামনের সারিতে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রথমে কথা কাটাকাটি হলেও পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়।
সংঘর্ষের সময় সভাস্থলের শতাধিক চেয়ার ভাঙচুর করা হয় এবং বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দুই দলের অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।

দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ ও প্রাণহানি
বিকেলের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও সন্ধ্যার দিকে ঝিনাইগাতী শহরে আবারও বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় মাওলানা রেজাউল করিম গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের এক পর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে ইট ও কঠিন বস্তু নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। প্রথমে তাঁকে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শেরপুর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত সাড়ে নয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
রাজনৈতিক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ
ঘটনার পরপরই জামায়াতে ইসলামী জেলা শাখার আমির হাফিজুর রহমান বিএনপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন,
“আমরা দ্রুত মামলা করব। যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।”
অন্যদিকে বিএনপি পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলটির নেতারা দাবি করছেন, সংঘর্ষের জন্য উভয় পক্ষই দায়ী এবং ঘটনাটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা প্রয়োজন।
নিহত নেতার পরিচয় ও সামাজিক ভূমিকা
নিহত মাওলানা রেজাউল করিম ছিলেন ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক এবং স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। তিনি এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর বাড়ি শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শোকাচ্ছন্ন পরিবেশ। স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, আর এলাকাবাসী ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন,
“রেজাউল করিম খুবই ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমরা চাই এই ঘটনার সঠিক বিচার হোক।”
প্রশাসনের অবস্থান
শেরপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক উপল হাসান জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক উত্তাপ
এই ঘটনার পর শেরপুরে নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, আর সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছে—এ ধরনের সংঘর্ষ ভবিষ্যতে আরও বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব এবং দলীয় সংঘাতই এই ধরনের সহিংসতার মূল কারণ। যদি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
Analysis | Habibur Rahman