১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল
শরীয়তপুর সদর উপজেলার শৌলপাড়া ইউনিয়নে রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের জেরে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বর্তমান চেয়ারম্যান ভাষানী খান ও তাঁর কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা।

সদ্য আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) গভীর রাতে উপজেলার চরগয়ঘর এলাকায় এই নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। হামলায় চেয়ারম্যানের বাড়িসহ মোট ৯টি বসতঘর ভাঙচুর এবং ৩টি ঘরে আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হামলার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতি
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে একদল দুর্বৃত্ত প্রথমে ইউপি চেয়ারম্যান ভাষানী খানের বাসভবন লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এ সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়াতে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর হামলাকারীরা চেয়ারম্যানের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
চেয়ারম্যানের বাড়িতে হামলার পর দুর্বৃত্তরা দলবদ্ধ হয়ে তাঁর অনুসারীদের বাড়িঘরে চড়াও হয়। একে একে আরও আটটি বাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং এর মধ্যে তিনটি বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার সময় চেয়ারম্যান ভাষানী খান বাড়িতে ছিলেন না। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমিয়েছেন। ঘটনার রাতে বাড়িতে ছিলেন ভাষানী খানের শাশুড়ি রাশিদা বেগম।
ভয়ার্ত কণ্ঠে রাশিদা বেগম বলেন, ‘রাতে ককটেলের বিকট শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। এরপর দেখি ১৫-২০ জন লোক দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়ে। তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। কারা, কেন এই হামলা করল, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দলবদল
ভাষানী খান শরীয়তপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভাষানী খান কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে এলাকায় ফিরে আসেন। গত ১৭ জানুয়ারি শরীয়তপুর-১ আসনের বিএনপি দলীয় প্রার্থী সাঈদ আহমেদ আসলামের উপস্থিতিতে এক জনসভায় ভাষানী খান তাঁর প্রায় পাঁচ শতাধিক সমর্থক নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। এই যোগদানের এক সপ্তাহের মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটল।
অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অভিযোগ
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভাষানীর সমর্থক ইদ্রিস খান অভিযোগ করেন, স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ তাদের দলবদলকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। দুর্বৃত্তরা ইদ্রিস খানের বসতঘরটি পুড়িয়ে দিয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ইদ্রিস খান বলেন, ‘চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আমরা বিএনপিতে যোগ দিয়েছি, এটাই আমাদের অপরাধ। এ কারণে স্থানীয় বিএনপির একটি পক্ষ আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল এবং কয়েক দিন ধরে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল। তারাই আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।’
নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া ও পুলিশি পদক্ষেপ
হামলার খবর পেয়ে শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন শরীয়তপুর-১ (সদর ও জাজিরা) আসনের বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আহমেদ আসলাম। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন এবং এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।
সাঈদ আহমেদ আসলাম বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ওপর এমন বর্বর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। হামলাকারীরা যে দলেরই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শরীয়তপুর সদরের চিকন্দী পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক গোলাম রাসুল জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আলামত হিসেবে তিনটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করেছে।
তিনি বলেন, ‘কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
Analysis | Habibur Rahman