১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল অস্ট্রেলিয়া সরকার। ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার অভিযোগে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার স্যামি ইয়াহুদের (Sammy Yahudu) ভিসা বাতিল করা হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

ঘটনার বিবরণ
অস্ট্রেলিয়ার একাধিক শহরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার কথা ছিল স্যামি ইয়াহুদের। কিন্তু তাঁর নির্ধারিত ফ্লাইটের মাত্র তিন ঘণ্টা আগে তাঁকে জানানো হয় যে, তাঁর ভিসা বাতিল করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ইহুদিদের সংগঠন ‘অস্ট্রেলিয়ান জিউয়িশ অ্যাসোসিয়েশন’ (এজেএ) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তাঁর অস্ট্রেলিয়া সফর ভেস্তে গেছে।
সরকারের কঠোর বার্তা
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত সোমবার সন্ধ্যায় তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতাবলে স্যামির ভিসা বাতিলের নির্দেশ দেন। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টনি বার্ক বলেন, “কেউ যদি অস্ট্রেলিয়ায় আসতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই সঠিক ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে এবং আসার উদ্দেশ্য সৎ হতে হবে।”
তিনি স্পষ্ট ভাষায় আরও বলেন, “বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে কাউকে এই দেশে আসার অনুমতি দেওয়া সঠিক কাজ নয়।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যে বোঝা যায়, অস্ট্রেলিয়া তাদের মাটিতে কোনো প্রকার ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি বরদাস্ত করতে রাজি নয়।
স্যামি ইয়াহুদের প্রতিক্রিয়া
ভিসা বাতিলের খবরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্যামি ইয়াহুদ। সারা রাত ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টে তিনি অস্ট্রেলিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এটি মোটেও আমার ব্যক্তিগত কোনো গল্প নয়। এটি সরকারের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার নজির। একে নির্যাতন, সেন্সরশিপ এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। আমরা এমন আচরণ মেনে নিতে পারি না।”
বিতর্কের সূত্রপাত
যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা এবং বর্তমানে ইসরায়েলের নাগরিক স্যামি ইয়াহুদ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) ইসলাম ধর্মকে লক্ষ্য করে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। গত ৬ নভেম্বর তিনি একটি পোস্টে লেখেন, “যারা আমাদের প্রতি সহনশীল নয়, তাদের প্রতি সহনশীল হওয়া বন্ধ করার সময় এসেছে।” ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর তথ্যমতে, তাঁর এসব বক্তব্যকে সরাসরি ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আয়োজকদের অসন্তোষ
স্যামি ইয়াহুদের সফরের মূল আয়োজক ছিল ‘অস্ট্রেলিয়ান জিউয়িশ অ্যাসোসিয়েশন’ (এজেএ)। সংগঠনটি জানায়, অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় সিনাগগ এবং বিভিন্ন ভেন্যুতে স্যামির বক্তব্য রাখার কথা ছিল। ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে হামলার ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের ভিসা বাতিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রয়োগ এক্ষেত্রে দেখা গেল। সংগঠনটি ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষণ
অস্ট্রেলিয়া বরাবরই বহুসংস্কৃতির দেশ হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির সরকার ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণাসূচক বক্তব্যের বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, স্যামি ইয়াহুদের ভিসা বাতিলের ঘটনাটি তারই প্রতিফলন। একজন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। Analysis | Habibur Rahman