১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৩৫ বৃহস্পতিবার শীতকাল
ময়মনসিংহের ভালুকায় এক পোশাককর্মীকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা এবং লক্ষ্মীপুরে রাজনৈতিক নেতার ঘরে আগুন দিয়ে শিশুকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এই দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
রোববার (২২ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায়। আসক মনে করে, এসব ঘটনাকে এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন সহিংসতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।
ভালুকায় মধ্যযুগীয় কায়দায হত্যা
বিবৃতিতে ময়মনসিংহের ভালুকার ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে ‘পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড’-এর কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করা হয়। একটি পরিকল্পিত মব বা বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে প্রথমে পিটিয়ে হত্যা করে। নির্মমতার এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ডিভাইডারের একটি গাছে তার বিবস্ত্র মরদেহ ঝুলিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
আসক উল্লেখ করে, সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিকের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত ও বিচারের এখতিয়ার কেবলমাত্র আদালতের। মব তৈরি করে তাৎক্ষণিক রায় কার্যকর করার এই প্রবণতা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং সংবিধান স্বীকৃত ‘জীবনের অধিকার’ ও ‘আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার’-এর চরম লঙ্ঘন।
লক্ষ্মীপুরে শিশু হত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতা
অন্যদিকে, ১৯ ডিসেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বসতঘরে বাইর থেকে তালা লাগিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ঘরের ভেতরে আটকে থাকা সাত বছরের এক নিষ্পাপ শিশু দগ্ধ হয়ে মারা যায়। আসক এই ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পাশাপাশি মানবিকতার চরম অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, একটি শিশুকে এভাবে পুড়িয়ে মারার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে। এটি কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সক্ষমতার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক দায়
আসক তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর বিচার না হওয়ায় দেশে এক ধরনের ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে। সংগঠনটির মতে, ঘটনার পর কেবল কয়েকজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ আসামিদের পাশাপাশি এর পেছনের ইন্ধনদাতা, পরিকল্পনাকারী ও ‘মব’ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতায় উৎসাহদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
একই সঙ্গে, এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো গাফিলতি বা ব্যর্থতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
রাষ্ট্রের প্রতি কঠোর বার্তা
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব ঘটনা যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আসক। সংগঠনটি সরকারকে সতর্ক করে বলেছে, রাষ্ট্র যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কালক্ষেপণ করে, তবে এই সহিংসতা সমাজের গভীরে প্রোথিত হবে। আর এই অরাজক পরিস্থিতির দায়ভার রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না।
Analysis | Habibur Rahman

