১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:১৮ সোমবার বসন্তকাল
গাজার বিধ্বস্ত জনপদে যখন প্রতিটি দিন নতুন বিপর্যয়ের খবর নিয়ে আসে, তার মাঝে সামনে এল এক অবিশ্বাস্য, হৃদয়বিদারক এবং একই সঙ্গে ভীতিকর গল্প। মাত্র ১২ বছরের রাগাদ আল-আসার—যাকে হাসপাতালে ‘মৃত’ ঘোষণা করে মর্গে পাঠানো হয়েছিল—সে আট ঘণ্টা পর বরফঠান্ডা ফ্রিজের ভেতর থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছে। এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর আশ্চর্য রক্ষা নয়; বরং গাজায় ভেঙে পড়া চিকিৎসা ব্যবস্থার নগ্ন দুর্দশার আরও একটি প্রমাণ।
হামলার রাত: ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাওয়া এক শিশু
৮ জুন, কেন্দ্রীয় গাজায় হঠাৎই আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গুলি, ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের গর্জন। রাগাদের নিজের ভাষায়—“আমরা ঘরে বসে ছিলাম, হঠাৎ সবকিছু দুলে উঠল।” মুহূর্তের মধ্যে তাদের ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দুই বোন নিহত হয়, পরিবারের বাকিরা আহত। রাগাদকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তাকে ভুলবশত মৃত ঘোষণা করা হয়।
ঠান্ডা ফ্রিজে জীবন্ত মৃত্যু
যে স্ল্যাবে মৃতদেহ রাখা হয়—সেই বরফঠান্ডা ফ্রিজে টানা আট ঘণ্টা অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল রাগাদ। কোনো হৃদস্পন্দন শোনা যায়নি, শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়—মেডিকেল ভুলের কারণে তাকে জীবিত থেকেও মৃতের সারিতে রাখা হয়।
অলৌকিক আবিষ্কার
একজন ফিলিস্তিনি বাবা নিজের সন্তানের দেহ খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করেন—এক শিশুর আঙুল কাঁপছে। তিনি দ্রুত ডাক দেন চিকিৎসকদের। পরীক্ষা করে তারা বিস্ময়ে দেখতে পান—যাকে মৃত বলে পাঠানো হয়েছিল, সে আসলে বেঁচে আছে। তখনই শুরু হয় আরেক দৌড়—এইবার জীবন বাঁচানোর জন্য।
জীবন ও মানসিক যন্ত্রণার লড়াই
রাগাদ দুই সপ্তাহ কোমায় ছিল। জ্ঞান ফেরার পর পরিবার তাকে জানায়—সে মর্গের ফ্রিজে ঘুমিয়ে ছিল। সেদিনের স্মৃতি যেন তার ভেতর গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।
তার বাবা জানান—“হাঁটার সময় হঠাৎ পড়ে যায়, শব্দ পেলেই ভয় পায়।”
রাগাদ নিজেও বলে—রাতে ঘুমালেই যুদ্ধের শব্দ শুনতে পায়, ঘন ঘন দুঃস্বপ্নে কেঁপে ওঠে। বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়াই এখন তার একমাত্র কামনা।
অন্যদিকে, রাগাদের বড় বোন এখনও গুরুতর অবস্থায়। এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, শরীরে গভীর ক্ষত এবং ভেতরে জটিলতা রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের পতনের নির্মম উদাহরণ
দুই বছরের বোমাবর্ষণে গাজার হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব—সবকিছু প্রায় অচল হয়ে গেছে। চিকিৎসক কমে গেছে, যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়েছে, আর মর্গগুলো এতটাই চাপের মুখে যে ভুল শনাক্তকরণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। রাগাদের ঘটনা সেই দুরবস্থার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
একটি শিশুর গল্প, হাজারো জীবনের প্রতিচ্ছবি
জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলি অভিযানে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে। ইউনিসেফের তথ্য আরও ভয়াবহ—৬৪ হাজার শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। মোট নিহতের সংখ্যা ৬৯ হাজার ছাড়িয়েছে।
এই ভয়াবহতার মাঝেই রাগাদের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি যেন এক ক্ষুদ্র আলো—যুদ্ধের অন্ধকারে মাঝেমধ্যে জ্বলে ওঠা মানবিকতার আলো। কিন্তু সেই আলো মনে করিয়ে দেয়—গাজার শিশুরা শুধু গোলাগুলির মাঝেই নয়, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাঝেও জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছে।
রাগাদের ফিরে আসা এক বিস্ময়—কিন্তু একই সঙ্গে একটি তীব্র প্রশ্নও রেখে যায়:
গাজায় কত শিশুকে বাঁচানোর সুযোগই মিলছে না
Analysis | Habibur Rahman


