.
রাজনীতি

শাকসু নির্বাচন নিয়ে অচলাবস্থা: তিন শর্তের ‘মুচলেকা’ মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা, প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে সুরাহা মেলেনি

Email :5

৩০শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ৯:৪৬ বুধবার শীতকাল

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (শাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অলিখিত নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রার্থীদের সামনে তিনটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তবে মঙ্গলবার রাতে এসব শর্তকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘হাস্যকর’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন সম্মিলিত শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা। শর্তসাপেক্ষে অঙ্গীকারনামা বা মুচলেকা দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে দিনভর বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন তাঁরা।

শাকসু নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। মঙ্গলবার রাতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনেছবি: প্রথম আলো

শর্তের বেড়াজালে নির্বাচন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হন উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ক্যাম্পাসে ফিরে সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম শিক্ষার্থীদের তিনটি শর্তের কথা জানান।

শর্তগুলো হলো:
১. নির্বাচন চলাকালীন কোনো প্রকার সহিংসতা ঘটানো যাবে না।
২. নির্বাচনের আগে ও পরে ক্যাম্পাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি হতে দেওয়া যাবে না।
৩. এই নির্বাচন কোনোভাবেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারবে না।

সহ-উপাচার্য জানান, প্রার্থীদের এই তিন শর্ত মেনে লিখিত অঙ্গীকারনামা শাকসু নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটি ইসিতে পাঠাবে এবং সবুজ সংকেত পেলেই নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

প্রার্থীদের ক্ষোভ ও প্রত্যাখ্যান
প্রশাসনের এই ঘোষণার পরপরই প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থানরত ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও স্বতন্ত্র প্যানেলের কয়েক শ শিক্ষার্থী বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁরা স্লোগান দিয়ে এই শর্তগুলোকে নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করার কৌশল হিসেবে অভিহিত করেন।

বিক্ষোভ চলাকালে ভিপি প্রার্থী মুহয়ী শারদ প্রশাসনের শর্তের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। আমাদের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কোনো আইনি ক্ষমতা নেই, তাই আমরা কীভাবে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেব? আর ছাত্র সংসদের নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের প্রভাবের বিষয়টি হাস্যকর ও অবান্তর। এই ধরনের অঙ্গীকারনামা দেওয়া মানে নিজেদের ঘাড়ে অযৌক্তিক দায় নেওয়া।”

শিবির সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম জানান, তাঁরা কোনো মুচলেকা দেবেন না। সকল প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, তাঁরা বুধবার বেলা ১১টায় প্রশাসনের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করবেন, যেখানে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সহযোগিতার কথা উল্লেখ থাকবে, কিন্তু কোনো শর্ত মানা হবে না।

ভিন্ন সুর কোষাধ্যক্ষের
এদিকে সহ-উপাচার্য নির্দিষ্ট তিনটি শর্তের কথা বললেও কোষাধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেন বিষয়টিকে কিছুটা নমনীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বিষয়টি ঠিক স্পেসিফিক তিন শর্তের অনুমতি নয়। কমিশন চায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেন জাতীয় নির্বাচনের কোনো কাজে ব্যাঘাত না ঘটে। প্রার্থীরা যদি স্থানীয় প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দেন, তবে কমিশনের আপত্তি থাকবে না।”

শিক্ষকদের উদ্বেগ ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন
শাকসু নির্বাচন নিয়ে ইসির এমন হস্তক্ষেপকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী বলে দাবি করেছে শিক্ষকদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক’ (ইউটিএল)-এর শাবিপ্রবি চ্যাপ্টার। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সদস্যসচিব মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে কি না, তা ইসি নির্ধারণ করে দিতে পারে না। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেও গত ৬ জানুয়ারি জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই শাকসু নির্বাচন আটকে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।” তাঁরা ইসির সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিকে ‘পক্ষপাতমূলক ও তড়িঘড়ি’ সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন।

চলমান পরিস্থিতি
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ রাত গভীর পর্যন্ত গড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাত আটটার পর উপাচার্যের সম্মেলনকক্ষে প্রার্থীদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসে প্রশাসন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (রাত ১১টা), উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চললেও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। প্রশাসনিক ভবনের বাইরে তখনো বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী নির্বাচনের দাবিতে অবস্থান করছিলেন।

বুধবার সকালে স্মারকলিপি প্রদানের পর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত শাকসু নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts