.
খেলা

ট্রাম্পের ‘যুদ্ধংদেহী’ মনোভাব: যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ব্রিটিশ সংসদে নিষেধাজ্ঞার ঝড়

Email :3

৩০শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ৮:২২ বুধবার শীতকাল

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের বাঁশি বাজতে বাকি আর মাত্র আড়াই বছর। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় বসতে যাওয়া ফুটবলের এই মহাযজ্ঞকে ঘিরে যখন উৎসবের আমেজ শুরু হওয়ার কথা, ঠিক তখনই মাঠের বাইরের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের জেরে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছে যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্যরা।

বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পরয়টার্স

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ২৩ জন এমপির একটি দল ফিফা এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছে এই দাবি জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী কোনো দেশ কি বিশ্বমঞ্চে খেলাধুলার আয়োজক হতে পারে?

‘শান্তি পুরস্কার’ বনাম যুদ্ধের দামামা
ঘটনার নাটকীয়তা শুরু হয় গত ডিসেম্বরে, যখন ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ফিফার প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেন। তখন বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনে ট্রাম্পের ভূমিকার জন্য এই স্বীকৃতি। কিন্তু পুরস্কার গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনী এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে।

ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ‘অবৈধ নেতা’ ও ‘মাদক পাচারকারী’ হিসেবে অভিহিত করলেও, মাদুরো নিজেকে ‘যুদ্ধবন্দী’ দাবি করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন মানা হয়নি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ব্রিটিশ এমপিরা সরব হয়েছেন।

রাশিয়ার জন্য এক নিয়ম, আমেরিকার জন্য ভিন্ন?
যুক্তরাজ্যের লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি এবং প্লাইড কামরুর ২৩ জন সাংসদ এক যৌথ বিবৃতিতে ফিফার দ্বিমুখী আচরণের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের যুক্তি, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে যদি রাশিয়াকে ফিফা ও অলিম্পিক থেকে নিষিদ্ধ করা যায়, তবে একটি স্বাধীন দেশের (ভেনেজুয়েলা) রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক এবং সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্র কেন শাস্তির মুখে পড়বে না?

ব্রিটিশ এমপি ব্রায়ান লেইশম্যান স্পষ্টভাবে প্রশ্ন রেখেছেন, “রাশিয়ার ক্ষেত্রে যে নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, আমেরিকার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হবে কেন? আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এমন দ্বিমুখী নীতি চলতে পারে না।”

সাংসদদের দাবি, অলিম্পিক বা বিশ্বকাপের মতো আসরকে কোনো পরাশক্তির রাজনৈতিক বা সামরিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে দেওয়া উচিত নয়।

মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ড ও কলম্বিয়ার আকাশে শঙ্কার মেঘ
শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি বার্তাগুলো ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশগুলোকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে মেক্সিকো সীমান্তে মার্কিন সেনা পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দেশে কোনো বিদেশি সামরিক অভিযান মেনে নেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ব্যাপারেও ট্রাম্প অনড়। আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্বীপটি বর্তমানে ডেনমার্কের অধীন। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য এবং প্লে-অফ পার করতে পারলে তারা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে বল প্রয়োগ করে, তবে ডেনমার্ক বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ক্রীড়া বিশ্লেষক জন জেরাফার মতে, এটি ফিফার জন্য এক বিশাল মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।

এছাড়া কলম্বিয়ার বিরুদ্ধেও সামরিক অভিযানের ‘বাস্তব হুমকি’ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। এমনকি কিউবা ও ইরানকেও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প।

ফিফা ও আইওসির নীরবতা ও ভবিষ্যৎ সংকট
এতসব উত্তেজনার মধ্যেও ফিফা বা আইওসি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো কঠোর বার্তা দেয়নি। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সখ্যতা অনেকেরই জানা। ফিফা ঘরোয়াভাবে জানাচ্ছে, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান তাদের এখতিয়ারে নেই। আইওসি-ও আসন্ন অলিম্পিক নিয়ে একই সুরে কথা বলছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আগামী ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ইরান, হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলোর সমর্থক ও খেলোয়াড়রা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে ভিসা জটিলতায় পড়তে পারেন। ফিফা একটি ‘ঐক্যবদ্ধ’ টুর্নামেন্টের প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্বকাপ এবং ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে হতে যাওয়া অলিম্পিক—এই দুই মেগা ইভেন্টকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র যে আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে, তা শেষ পর্যন্ত খেলার মাঠকে রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে পরিণত করে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts