.
অন্যান্য

ছোটবেলার ক্ষত: ৭টি লক্ষণ যা বলে দেয় ট্রমা এখনো আপনাকে ভোগাচ্ছে

Email :3

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১২:০৮ বৃহস্পতিবার শীতকাল

‘পাস্ট ইজ পাস্ট’—কথাটি জীবনের অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও, শৈশবের ট্রমার বেলায় তা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। মনের গভীরে চাপা পড়া ছোটবেলার আঘাত অনেক সময় বড় হয়েও নানা রূপে আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। অনেকে ভাবেন, সময়ের সঙ্গে ক্ষত শুকিয়ে যাবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ট্রমাও অবচেতনে আমাদের সঙ্গে বেড়ে ওঠে, আমাদের আচরণ, অনুভূতি ও সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলে। খালি চোখে হয়তো আমরা এই ক্ষত চিহ্নিত করতে পারি না, কিন্তু এর উপস্থিতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যে শৈশবের আঘাতের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। একে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের (পিটিএসডি) বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যা নির্ণয় করা প্রায়শই কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় অর্ধেকই শৈশবে কোনো না কোনো ট্রমার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, যদিও সব ক্ষেত্রে তা পিটিএসডিতে রূপ নেয় না। বাংলাদেশে এই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ না থাকলেও, পরিস্থিতি যে ভিন্ন নয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের সমাজে এই নীরব সংগ্রাম প্রতিনিয়ত চলছে, যার লক্ষণগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।

চলুন জেনে নিই সেই ৭টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, যা আসলে ছোটবেলার বা অতীতের ট্রমারই প্রতিফলন হতে পারে:

১. অকারণ চমকে ওঠা বা বুক ধড়ফড়ানি
হুট করে কোনো অপ্রত্যাশিত শব্দ, হঠাৎ করে কারো উপস্থিতি বা সামান্যতম ঝাঁকুনিতেই যদি আপনার শরীর কেঁপে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে ওঠে, বা তীব্র আতঙ্ক কাজ করে, তবে এটি কেবল স্নায়বিক দুর্বলতা নাও হতে পারে। এর পেছনে থাকতে পারে শৈশবের কোনো পুরোনো ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা। আপনার স্নায়ুতন্ত্র হয়তো এখনও অতীতের বিপদকে বাস্তব মনে করে। উচ্চ শব্দ, চিৎকারে অসহিষ্ণুতা বা হঠাৎ কোনো পরিস্থিতির জন্য অতিমাত্রায় প্রস্তুত থাকার প্রবণতাও এই ট্রমার লক্ষণ।

২. নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অন্যদের খুশি করার প্রবণতা
আপনি কি নিজের প্রয়োজন, সুখ বা স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়ে অন্যদের খুশি রাখতে সচেষ্ট থাকেন? নিজের বিরুদ্ধাচরণ করেও অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে চান? এটি আপনার ভেতরের অবহেলার ভয় বা ‘কর্নারড’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার ফল হতে পারে। শৈশবে অনেক কড়া শাসনের মধ্য দিয়ে গেলে ‘না’ বলা শেখা হয়ে ওঠে না, বাবা-মায়ের রাগ বা অসন্তুষ্টির ভয়ে থাকতে থাকতে ‘ইয়েস ম্যান’-এ পরিণত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। আবার, প্রতিনিয়ত সমালোচনা বা অবজ্ঞার শিকার হলে আত্মবিশ্বাসের অভাবে অন্যের অনুমোদন পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, যা আপনাকে একজন ‘মানুষকে খুশি করা’ (People-pleaser) ব্যক্তিতে পরিণত করে।

৩. ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও অস্থিরতা
হুট করে দামি জিনিসপত্র কেনা, মাত্রাতিরিক্ত কেনাকাটা করা, অকারণে অ্যাডভেঞ্চারের পেছনে ছোটা, নিজেকে নিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করা বা নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়া – এসবই অনেক সময় ভেতরের চাপ কমানোর একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায়। মনে হয়, কিছু একটা করলেই হয়তো মনের ভেতরের ভারটা হালকা হবে। কেউ কেউ আবার জেনে-বুঝে বিপজ্জনক সম্পর্কে জড়ান বা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বেছে নেন, যা আসলে ভেতরের শূন্যতা পূরণ বা পুরোনো কোনো যন্ত্রণাকে চাপা দেওয়ার অবচেতন প্রক্রিয়া। এই ধরনের অস্থিরতা এবং এক কাজে বেশিদিন থিতু হতে না পারার প্রবণতাও ট্রমার বহিঃপ্রকাশ।

৪. বাস্তবতা থেকে পলায়ন: অবিরাম ছুটে চলা
আপনি কি কোথাও দুদণ্ড স্থির থাকতে পারেন না? এক জায়গায় থিতু হওয়া আপনার জন্য কঠিন? ক্রমাগত দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো বা এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটে যাওয়া আপনার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ? এই অবিরাম ছুটে চলা আপনার কোনো অতীত বা কঠোর বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর একটি বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। মানসিক বা আবেগগত স্থিতিশীলতা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা এবং নিজের ভেতরের যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়া এড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে এই পলায়ন মনোবিজ্ঞানে পরিচিত। এটি আসলে ভেতরের অস্বস্তি থেকে মনোযোগ সরানোর একটি প্রক্রিয়া।

৫. অনবরত ভয় ও অতি-সতর্কতা (হাইপারভিজিলেন্স)
আপনার চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও যদি আপনার মনে হয় কোনো বিপদ আসন্ন, আপনি সর্বদা সতর্ক অবস্থায় থাকেন, তবে এটি হাইপারভিজিলেন্স বা অতি-সতর্কতা। যারা শৈশবে অনিরাপদ পরিবেশে বড় হয়েছেন, তারা বড় হতে হতে এই স্থায়ী সতর্কাবস্থা ধরে রাখেন। তাদের ভেতরের অ্যালার্ম সিস্টেম সবসময় চালু থাকে, ফলে সামান্যতম শব্দ, নড়াচড়া বা পরিস্থিতির পরিবর্তনকেও তারা সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখেন। এর ফলে অনিদ্রা, ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং এমনকি সবচেয়ে কাছের মানুষদের প্রতিও সন্দেহ প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

৬. আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা
ছোটখাটো বিষয়েও কি আপনার রাগ, দুঃখ, অভিমান বা আনন্দে মাত্রাতিরিক্ত আবেগ প্রকট হয়ে ওঠে? সহজে চোখে জল আসে? অথবা, হঠাৎ করেই আপনি বিস্ফোরিত হন, কোনো কিছুতেই সহনশীলতা দেখাতে পারেন না? এই আবেগীয় অস্থিরতা, যাকে ইংরেজিতে Emotional Dysregulation বলা হয়, শৈশবের ট্রমার একটি স্পষ্ট লক্ষণ। যাদের ছোটবেলায় আবেগ প্রকাশ করতে বা সামলাতে শেখানো হয়নি, বা যাদের আবেগ প্রকাশকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা যায়। ফলস্বরূপ, তারা সামান্য উদ্দীপনাতেই তীব্র আবেগ অনুভব করেন বা একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নেন (Emotional Numbness)।

৭. সম্পর্ক স্থাপনে জটিলতা ও আস্থাহীনতা
ট্রমাগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই অন্যের প্রতি অবিশ্বাস, ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলা এবং সুস্থ সম্পর্ক গড়তে না পারার সমস্যায় ভোগেন। শৈশবের আঘাত তাদের মনোজগতে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে, কেউই নিরাপদ নয় বা ভালোবাসার যোগ্য নয়। এর ফলে তারা হয় অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন (Codependency), অথবা আবেগীয় দূরত্ব বজায় রাখেন। বিশ্বাস স্থাপন করতে না পারার কারণে বন্ধুত্ব বা রোমান্টিক সম্পর্ক – যেকোনো ক্ষেত্রেই গভীর সংযোগ স্থাপন তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বারবার একই ধরনের ভুল সম্পর্ক বেছে নেওয়াও এর একটি লক্ষণ হতে পারে।

যদি এই লক্ষণগুলোর কোনোটি আপনার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান থাকে, তাহলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আপনি একা নন, এবং নিরাময় সম্ভব। এই বিষয়গুলো চিহ্নিত করা সুস্থতার দিকে প্রথম পদক্ষেপ। একজন অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। পেশাদার সহায়তা আপনার ভেতরের ক্ষতকে চিহ্নিত করতে, তা থেকে মুক্তি পেতে এবং একটি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন যাপনে সাহায্য করতে পারে। মনে রাখবেন, ছোটবেলার আঘাতের প্রভাব কাটানো কঠিন হতে পারে, তবে অসম্ভব নয়।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts