১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৪৩ বৃহস্পতিবার শীতকাল
বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ইতিহাসে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে এক ‘ভয়াবহ দিন’ হিসেবে। রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার এবং ছায়ানট কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাকরুদ্ধ দেশের সৃজনশীল সমাজ। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন নির্মাতা, অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীরা।

বৃহস্পতিবার রাতে দুর্বৃত্তদের তান্ডবে ভস্মীভূত হয়েছে প্রথম আলো কার্যালয়ের একাংশ, ভাঙচুর ও আগুনের গ্রাস থেকে রেহাই পায়নি দ্য ডেইলি স্টার ও বাঙালির সংস্কৃতির বাতিঘর ছায়ানট। এই নজিরবিহীন সহিংসতার প্রতিবাদে শিল্পীরা বলছেন, কলমের জবাব কলমে দিতে হয়, আগ্নেয়াস্ত্র বা আগুন দিয়ে নয়।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত গণমাধ্যম কার্যালয়
হামলাকারীরা প্রথম আলো কার্যালয়ে প্রথমে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং পরবর্তীতে অগ্নিসংযোগ করে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলা আগুনে ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত নথিপত্র ও মূল্যবান সম্পদ। আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করেছে পাঠক সংগঠন ‘বন্ধুসভা’র কক্ষটিও, যা নিয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংগঠনটির সাবেক সদস্য ও অভিনেতা খায়রুল বাসার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি খায়রুল বাসার ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘সহিংসতা ও ভাঙচুর কখনোই ন্যায্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। আমাদের বন্ধুসভা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—যেখানে মানুষ হওয়ার চর্চা হতো। আমরা চেয়েছিলাম প্রতিদিন একটি ভালো কাজের মাধ্যমে সুন্দর আগামীর দিকে এগিয়ে যেতে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘জনতা অধিকারের কথা বলবে, কিন্তু সহিংসতা জনতার কাজ হতে পারে না। যারা জনতা সেজে সহিংসতা করছে, তারা মূলত জনতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কলমের জবাব কলমে দিতে হয়, আঘাত করতে মেধা লাগে না। ছায়ানট ভেঙে গান থামানো যাবে না; মনে রাখবেন—নজরুল, রবীন্দ্র, লালন ছাড়া বাংলা অসম্পূর্ণ।’
রুদ্ধশ্বাস রাত ও উদ্ধার অভিযান
একই রাতে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়েও চলে নারকীয় তান্ডব। সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় ভেতরে আটকা পড়েছিলেন সাংবাদিক ও অভিনেত্রী নাজিবা বাশার। আতঙ্কের সেই প্রহর শেষে ভোর ছয়টায় সেনাবাহিনীর সহায়তায় তিনি উদ্ধার পান। নাজিবার বাবা, জ্যেষ্ঠ অভিনেতা ফখরুল বাশার ফেসবুকে মেয়ের নিরাপদে বাড়ি ফেরার খবর নিশ্চিত করে লেখেন, ‘সকাল ছয়টায় আর্মিরা এসে নাজিবাকে বাসায় দিয়ে গেছে।’
নির্মাতা তানহা জাফরীন এই ঘটনাকে সাংবাদিকতার জন্য এক ‘ভয়াবহ দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অসহিষ্ণুতা এখন চরমে পৌঁছেছে। প্রতিহিংসার রাজনীতি আমাদের গা শিউরে ওঠার মতো পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’
প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের আহ্বান
হামলাকারীরা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে পুঁজি করে এই অরাজকতা চালিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে। তবে শিল্পীরা বলছেন, হাদির হত্যার বিচার অবশ্যই কাম্য, কিন্তু তার নামে সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মান বলেন, ‘ওসমান হাদির মৃত্যুতে আমরা শোকাহত এবং হত্যাকারীদের বিচার চাই। কিন্তু হাদি বেঁচে থাকলে নিজের দেশের সম্পদ ধ্বংসের এই তান্ডব কখনোই সমর্থন করতেন না। দেশের দুটি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করতে পারছে না, এটা আমাদের জন্যই চরম ক্ষতি।’ তিনি আক্রমণকারীদের ‘হুজুগে বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ কার স্বার্থ হাসিল করল?
সংস্কৃতির ওপর আঘাত ও শিল্পীদের প্রতিরোধ
ছায়ানটের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় সংগীত ও নৃত্যশিল্পীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ভাঙচুরের ছবি শেয়ার করে সংগীতশিল্পী অর্ণব লিখেছেন, ‘আমাদের ভোট দিতে হবে, নতুবা সংগীতশিল্পীরা বিপদে পড়ব। ভোটের মাধ্যমেই আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
অভিনয়শিল্পী কাজী নওশাবা আহমেদ লিখেছেন, ‘বন্ধু, তোমার পাশের সাথিকে চিনে নিয়ো।’ অন্যদিকে নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই যুদ্ধ আমাদের কাছে নতুন না। গান চলবেই। আমরা পুড়তে জানি, মরতে জানি না।’ ভাঙচুর করা ছায়ানটের ছবি পোস্ট করে সংগীতশিল্পী সায়ন্তনী ত্বিষা লিখেছেন, ‘আজকের ছায়ানট।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে এখন শুধুই বিষাদ আর ক্ষোভ। শিল্পীদের অভিন্ন সুর—যুক্তিতর্ক আর মেধার লড়াই ছেড়ে সহিংসতার এই পথ পরিহার না করলে, তা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ ডেকে আনবে।