১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ১২:০১ বৃহস্পতিবার শীতকাল
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে আশার কথা হলো, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে গেলে এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
গতকাল প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’-এর জানুয়ারি সংস্করণে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির নেপথ্য কারণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে অর্থনীতির এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, আগামী দিনগুলোতে মানুষের ভোগ ব্যয় বা কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার বৃদ্ধি পাবে, যা অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপ কিছুটা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিলে তা শিল্প খাতকে শক্তিশালী করবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে বলে মনে করছে এই বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাটি।
চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির জায়গা
উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি অর্থনীতির কিছু দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে, যার ফলে বাজারে ঋণের প্রবাহ কমেছে। ঋণের এই সংকোচন ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে সাময়িক বাধার সৃষ্টি করছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে ভুটান। দেশটিতে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এরপরই সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে ভারত।
অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মালদ্বীপে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় সাড়ে ৩ শতাংশ এবং নেপালে ২ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে এবারের প্রতিবেদনে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের প্রবৃদ্ধি নিয়ে কোনো পূর্বাভাস দেয়নি সংস্থাটি।
বিবিএসের তথ্যে মিলছে সামঞ্জস্য
বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাসের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যের বেশ মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিবিএসের দেওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ। যেখানে গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ, পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যও অর্থনীতির ধীরলয়ে পুনরুদ্ধারের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাস সঠিক পথে এগোলে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসবে।
Analysis | Habibur Rahman
