.
অর্থনীতি

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বড় দরপতন: এক বছরেই কমল ২০ শতাংশ, নেপথ্যে যুদ্ধবিরতির আভাস

Email :22

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ৪:২৯ বৃহস্পতিবার শীতকাল

বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির জোরালো আলোচনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস নেমেছে। বিদায়ী বছরে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২০ সালের পর এক বছরে তেলের দামে এত বড় পতন আর দেখা যায়নি।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছেছবি: রয়টার্স

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শুক্রবারেও (পশ্চিমা সময় অনুযায়ী) বিশ্ববাজারে তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। মূলত ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কাই এই দরপতনের মূল কারণ।

সর্বশেষ বাজার পরিস্থিতি
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার ৬৪ সেন্টে স্থির হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৬ ডলার ৭৪ সেন্টে।

গত ১৬ ডিসেম্বর তেলের দাম গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এরপর সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় সাময়িক কিছুটা বাড়লেও, বছর শেষে সামগ্রিক চিত্র নিম্নমুখী। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৯ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ২১ শতাংশ কমেছে।

ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক ও সরবরাহের সমীকরণ
তেলের এই সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে আসন্ন ‘রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা’। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকের কথা রয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই বৈঠকের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে।

আলোচনা সফল হলে এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে রাশিয়ার তেল খাতের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার তেলের সরবরাহ পুনরায় বেড়ে যাবে। সরবরাহের এই সম্ভাব্য বৃদ্ধির খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তেলের দাম কমার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

শান্তিচুক্তির কাঠামো ও ভূ-রাজনীতি
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২০ দফার একটি শান্তিচুক্তি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আলোচনা এগোচ্ছে। চুক্তির খসড়া ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিষয়ক বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়ার পথে। জেলেনস্কি নিজেও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, নতুন বছরের আগেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসা সম্ভব। এমনকি রাশিয়া যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে ইউক্রেনে গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে ক্রেমলিন থেকেও ইতিবাচক সাড়া মেলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পাওয়ার পর ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

অর্থনৈতিক মন্দা ও চাহিদার ঘাটতি
কেবল যুদ্ধবিরতির আলোচনাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতিও তেলের দাম কমার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ায় শিল্প ও পরিবহনে জ্বালানির চাহিদা কমেছে। অন্যদিকে, চাহিদার তুলনায় অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন ক্রমশ বাড়ছে।

বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, আগামী বছরে বাজারে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত তেলের সরবরাহ বা ‘ওভার সাপ্লাই’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বৈশ্বিক তেলের মজুত বৃদ্ধি এবং চাহিদার ঘাটতি—এই দুইয়ে মিলে তেলের বাজারকে আরও নিচের দিকে টেনে নামাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তেলের বাজার এখন ক্রেতাদের অনুকূলে থাকারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts