
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দেখা যায় এক ভয়াবহ কিন্তু পরিচিত দৃশ্য—রেললাইনের ওপর বসে বাজার, লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটা মানুষের ভিড়, কিংবা ট্রেন আসার আগ মুহূর্তে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার। অনেকের কাছে এটি দৈনন্দিন জীবন, আবার কারও কাছে রোমাঞ্চ। কিন্তু বাস্তবে এই আচরণগুলোই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুর ফাঁদে।
আইন অনুযায়ী রেললাইনের নির্দিষ্ট সীমানায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও সচেতনতার অভাব ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় নিয়মগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অনেকেই জানেন না—রেললাইনের ওপর হাঁটা বা বসা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র রেললাইনে বসা বা চলাচলের কারণে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ইয়ারফোন কানে দিয়ে অসচেতনভাবে লাইনে হাঁটার সময় ১৬৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
রেলগেটেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। গেট নামার পরও অনেকে ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করেন। গত পাঁচ বছরে এমন অসতর্কতায় প্রাণ গেছে ১,৬৮১ জনের। এছাড়া ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও মৃত্যু হয়েছে বহু মানুষের।
অন্যদিকে, দেশের রেল অবকাঠামোতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। অনেক স্থানে রেলক্রসিং নেই, আবার কোথাও গেটম্যানের অভাব। প্রায় ১,৯৩৪টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ৭২৫টিই অবৈধ—যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান আইনটি ১৮৯০ সালের, যেখানে জরিমানা মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকা। নতুন আইনের খসড়ায় জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। ফলে আইনের ভয় না থাকায় মানুষ ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছে না।
রেলওয়ে পুলিশ বলছে, তাদের জনবল কম হওয়ায় সব জায়গায় নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, আইন থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন, কারণ মানুষ সচেতন নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মানতে অনীহা দেখায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন নয়—তার কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে এই সমস্যার মূল সমাধান।
প্রতিদিনের এই অবহেলা আর অসচেতনতা যদি না বদলায়, তাহলে রেললাইন শুধু যাতায়াতের পথ নয়—মৃত্যুর পথ হিসেবেই থেকে যাবে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সচেতন হবো, নাকি এভাবেই ঝরে যাবে আরও হাজার প্রাণ?