.
আন্তর্জাতিক

গ্রিনল্যান্ড সংকট: ইউরোপের ৮ দেশের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ, ক্ষুব্ধ বিশ্বনেতারা বললেন ‘অগ্রহণযোগ্য’

Email :21

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২৫ সোমবার বসন্তকাল

ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বে নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড দখলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি দেশের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণাকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউরোপের শীর্ষ নেতারা।

মার্কিন দখল প্রস্তাবের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার গ্রিনল্যান্ডে বিক্ষোভ। ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ছবি: রয়টার্স

শুল্ক যুদ্ধের ঘোষণা
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি বিতর্কিত পোস্ট করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প জানান, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই নতুন শুল্ক নীতি কার্যকর হবে। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি; স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আগামী জুন মাস থেকে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে।

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরোধিতাকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘আমাদের গ্রহের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।’

নেপথ্যে গ্রিনল্যান্ড ও সামরিক উত্তেজনা
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ চায় যুক্তরাষ্ট্র। আর্কটিক ও উত্তর আমেরিকার মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা এই দ্বীপটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অপরিহার্য। ট্রাম্প এর আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, তিনি ‘হয় সহজ পথে, অথবা কঠিন পথে’ গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবেন।

উত্তেজনার পারদ আরও চড়ে গত বৃহস্পতিবার, যখন গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষায় ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ আটটি ইউরোপীয় দেশ সেখানে তাদের সৈন্য মোতায়েন করে। ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তি, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কোনো একক দেশের হাতে নয়, বরং সম্মিলিতভাবে ন্যাটোর অধীনে থাকা উচিত। এই পদক্ষেপেই ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।

ইউরোপীয় নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপ। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বিষয়টিকে ন্যাটো জোটের ঐক্যের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘যৌথ নিরাপত্তা রক্ষার জেরে মিত্রদের ওপর এভাবে শুল্ক আরোপ করা সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত। আমরা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে এ নিয়ে সরাসরি আলোচনা করব।’

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হুমকিতে আমরা প্রভাবিত হব না।’

অন্যদিকে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের ‘জিম্মি’ হতে দেবেন না। সংকট মোকাবিলায় তিনি নরওয়ে, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ‘আচমকা আসা হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বাণিজ্য চুক্তিতে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্পের এই ঘোষণা দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের কনজারভেটিভ ইপিপি গ্রুপের প্রধান মানফ্রেড ওয়েবার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর ফলে গত বছর আলোচিত ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিটি ভেস্তে যেতে পারে। উল্লেখ্য, ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এমন একটি সমঝোতা হয়েছিল, যেখানে ইইউ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক এবং বিনিময়ে কিছু মার্কিন পণ্যে ইইউ বাজারে শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি ও গ্রিনল্যান্ডবাসীর প্রতিবাদ
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেছেন, উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ বা সক্ষমতা ডেনমার্কের নেই। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ আরও বেশি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ থাকবে।’

তবে গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষ এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দ্বীপটির ৮৫ শতাংশ মানুষই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিপক্ষে। মার্কিন দখলদারিত্বের প্রস্তাবের প্রতিবাদে শনিবার গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক এবং ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘গ্রিনল্যান্ড থেকে হাত সরাও’ এবং ‘গ্রিনল্যান্ড শুধুই গ্রিনল্যান্ডবাসীর।’

ন্যাটো জোটের মিত্রদের মধ্যে এমন নজিরবিহীন বিভক্তি এবং পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts