.
অর্থনীতি

বদলেছে তরুণ বিলিয়নেয়ারদের তালিকা: জাকারবার্গের যুগ শেষে নতুন দশের উত্থান

Email :4

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩৮ বৃহস্পতিবার শীতকাল

একসময় মার্ক জাকারবার্গ ছিলেন তরুণ আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতিদের অবিসংবাদিত রাজা। কিন্তু বয়স ৪০ পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মুকুট এখন নতুন প্রজন্মের হাতে। ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রকাশিত ৪০ বছরের কম বয়সী আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতিদের তালিকায় এসেছে নতুন মুখ, নতুন উদ্যম। এই নতুন তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন প্রযুক্তি, গেমিং, খেলনা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ খাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ উদ্যোক্তা।

২০০৮ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিশ্ব অর্থনীতিতে নাম লেখানো জাকারবার্গ একটানা ১১ বছর এই তালিকার শীর্ষে ছিলেন, যা এক অনবদ্য রেকর্ড। গুগলের ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনকে পেছনে ফেলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন তারুণ্যের প্রতীক। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ৪০তম জন্মদিন পার করার পর তিনি এই বয়সের সীমা থেকে বেরিয়ে যান। এরপর থেকেই এই তালিকার চিত্র দ্রুত বদলেছে।

দেখে নেওয়া যাক, বর্তমানে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই ব্যতিক্রমী ক্লাবে:

১. এডউইন চেন, সম্পদ ১৮ বিলিয়ন ডলার
বর্তমান তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছেন সার্জ এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা এডউইন চেন। ৩৮ বছর বয়সী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্যোক্তার মোট সম্পদ ১৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর প্রতিষ্ঠান সার্জ এআই, এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ডেটা লেবেলিং সার্ভিস দিয়ে থাকে। গুগল ও অ্যানথ্রপিকের মতো জায়ান্টরা তাদের গ্রাহক। ২০২৪ সালে ১২০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করা এই প্রতিষ্ঠানটির বিশেষত্ব হলো, চেন দাবি করেন, তিনি কোনো বাহ্যিক বিনিয়োগ ছাড়াই একে এই উচ্চতায় এনেছেন। এমআইটি থেকে গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং ভাষাবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী চেনের হাতে রয়েছে কোম্পানির প্রায় ৭৫ শতাংশ মালিকানা।

২. ওয়াং নিং অ্যান্ড ফ্যামিলি, সম্পদ ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ১৫.৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে ওয়াং নিং ও তাঁর পরিবার। ২০১০ সালে খেলনা কোম্পানি পপ মার্ট ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন ওয়াং। ২০২০ সালে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়া এই ৩৩ বিলিয়ন ডলারের (বাজারমূল্য) কোম্পানির চেয়ারম্যান ও সিইও তিনি নিজেই। ‘ব্লাইন্ড বক্স’ প্যাকেজিংয়ে বিক্রি হওয়া ছোট ফিগারিন ও প্লাশ খেলনার জন্য পপ মার্ট বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষ করে খরগোশ সদৃশ দুষ্টু হাসিওয়ালা লাবুবু পুতুলের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার ফলে গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

৩. প্যাট্রিক কলিসন ও জন কলিসন, সম্পদ ১০.১ বিলিয়ন ডলার
আয়ারল্যান্ডের গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে আসা দুই ভাই, প্যাট্রিক ও জন কলিসন, ১০.১ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে যুগ্মভাবে তৃতীয় স্থানে। ২০১০ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে তাঁরা যৌথভাবে ফিনটেক প্রতিষ্ঠান স্ট্রাইপ প্রতিষ্ঠা করেন, যখন তাঁরা এমআইটিতে পড়ছিলেন। প্যাট্রিক বর্তমানে স্ট্রাইপের সিইও এবং জন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্ট্রাইপের মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছিল ৯১.৫ বিলিয়ন ডলার।

৪. জাস্টিন সান, সম্পদ ৮.৫ বিলিয়ন ডলার
ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতের পরিচিত মুখ জাস্টিন সান ৮.৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে চতুর্থ স্থানে। ২০১২ সালে পেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিটকয়েনের প্রাথমিক ব্যবহারকারী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু। ২০১৭ সালে তিনি ট্রন ব্লকচেইন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিশাল একটি ক্রিপ্টো সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। সম্প্রতি, ২০২৪ সালে সান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রিপ্টো উদ্যোগে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চলমান বাজার কারসাজি তদন্ত স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্রের এসইসি।

৫. ক্লিফ ওবরেখট ও মেলানি পারকিন্স, সম্পদ ৭.৬ বিলিয়ন ডলার
স্বামী-স্ত্রী জুটি ক্লিফ ওবরেখট ও মেলানি পারকিন্স ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে। ২০১৩ সালে আরেক বিলিয়নেয়ার ক্যামেরন অ্যাডামসের সঙ্গে তাঁরা অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ডিজাইন সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম ক্যানভা চালু করেন। ওবরেখট সিওও এবং পারকিন্স সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা হলো, ভবিষ্যতে তাঁদের মালিকানার ৮০ শতাংশের বেশি অলাভজনক ক্যানভা ফাউন্ডেশনে দান করা। গত আগস্টে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ক্যানভার মূল্যায়ন করেছেন ৪২ বিলিয়ন ডলার।

৬. ভ্লাদ তেনেভ, সম্পদ ৬.৬ বিলিয়ন ডলার
বুলগেরিয়ায় জন্ম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বেড়ে ওঠা ভ্লাদ তেনেভ ৬.৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে। ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বাইজু ভাটের সঙ্গে তিনি বিনা কমিশনে শেয়ার লেনদেনের অ্যাপ রবিনহুড মার্কেটস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২১ সালে নাসডাকে তালিকাভুক্ত হওয়া এই কোম্পানির বর্তমান বাজার মূলধন ১০৮ বিলিয়ন ডলার। রবিনহুডের চেয়ারম্যান ও সিইও তেনেভ সম্প্রতি টোকেনাইজেশন ও এআইভিত্তিক বিনিয়োগে জোর দিয়েছেন এবং গত সেপ্টেম্বরে কোম্পানিটি এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

৭. কাউ হাইয়ু, সম্পদ ৬ বিলিয়ন ডলার
অনলাইন গেমস ডেভেলপার মিহোইয়োর সহপ্রতিষ্ঠাতা কাউ হাইয়ু ৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে সপ্তম স্থানে। ২০১২ সালে শাংহাই-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি এর চেয়ারম্যান ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে সহপ্রতিষ্ঠাতা লিউ ওয়েইর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। সেন্সর টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের জনপ্রিয় গেম ‘জেনশিন ইম্প্যাক্ট’ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খেলোয়াড়েরা ৫০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ খরচ করেছেন।

৮. তৈমুর তারলভ, সম্পদ ৫.৯ বিলিয়ন ডলার
তালিকার অষ্টম স্থানে রয়েছেন তৈমুর তারলভ, যাঁর সম্পদ ৫.৯ বিলিয়ন ডলার। মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই ২০০৮ সালে কাজাখস্তানভিত্তিক রিটেইল ব্রোকারেজ ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ফ্রিডম হোল্ডিং প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই কোম্পানির বর্তমান বাজার মূলধন প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। পোস্ট-সোভিয়েত দেশগুলির নাগরিকদের মার্কিন ও ইউরোপীয় স্টক এক্সচেঞ্জে প্রবেশাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে ফ্রিডম হোল্ডিং বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেছে, বিশেষত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বিশেষজ্ঞ হিসেবে।

তবে, এই নতুন তালিকা একটি ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরে। ২০২১ সালের তুলনায় এই দলটির মোট সম্পদের পরিমাণ অনেকটাই কম। সেই সময়ে জাকারবার্গের একার সম্পদই বর্তমান শীর্ষস্থানাধিকারী এডউইন চেনের সম্পদের প্রায় পাঁচ গুণ ছিল। সামগ্রিকভাবে, বর্তমানে ৭১ জন আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতির মোট সম্পদ ২০২১ সালের তালিকার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পরিবর্তনশীল চিত্র ইঙ্গিত দেয় যে, তরুণ শতকোটিপতিদের দুনিয়া কেবল নতুন মুখের উন্মোচনই করছে না, বরং অর্থনৈতিক পরিবেশে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগও সৃষ্টি করছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts