.
জাতীয়

জকসু নির্বাচিত, কার্যভার অনিশ্চিত: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র সংসদ কার্যালয় সংকটে

Email :4

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩৭ বৃহস্পতিবার শীতকাল

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যভার শুরুতেই এক বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থীরা অধিকাংশ পদে জয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেও, তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেই কোনো সুনির্দিষ্ট কার্যালয়। ফলশ্রুতিতে, নবনির্বাচিত জকসুর কার্যকর সূচনা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর সংশয়।

১৮৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর এই প্রথম গত ৬ জানুয়ারি জকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১০ জানুয়ারি প্রশাসন কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের জন্য সুনির্দিষ্ট ভবন বা কার্যালয় থাকলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কোথায় বসে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কার্যালয় সংকট ও বেহাল দশা
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জকসুর জন্য এখনো কোনো স্থায়ী কার্যালয় প্রস্তুত নয়। অতীতে কলেজ থাকাকালে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অবকাশ ভবনের ২০১ নম্বর কক্ষটি ব্যবহৃত হলেও, দীর্ঘ বিরতির কারণে সেটি এখন অব্যবহৃত ও বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কক্ষটি অপরিচ্ছন্ন, আসবাবপত্র এলোমেলো। এমনকি নির্বাচিত ২১ জন প্রতিনিধির একসঙ্গে বসার জন্যও এটি যথেষ্ট নয়। ভিপি, জিএস, এজিএসদের জন্য নিজস্ব কক্ষ, ডেস্ক, কম্পিউটার বা গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের মতো প্রয়োজনীয় জায়গারও অভাব রয়েছে। কলেজ থাকাকালে এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

নির্বাচিতদের উদ্বেগ: “বসবো কোথায়, কাজ করব কিভাবে?”
জকসুর নবনির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলাম এই অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “নির্বাচিত হওয়ায় শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকেরা আসবেন, তাঁদের সঙ্গে বসে কোথায় কথা বলব, আমরা জানি না। শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু দাবিদাওয়া এই মুহূর্তে ঝুলে আছে, এসব সমস্যার সমাধান না হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলা শুরু হবে। আমরা যৌক্তিক সমাধান চাই, কাজ করার সুযোগ দেওয়া হোক।” তিনি আশঙ্কা করছেন, দ্রুত একটি স্থায়ী কার্যালয় নির্ধারণ না হলে জকসুর কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়বে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা শোনা, প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা এবং দাপ্তরিক কাজের জন্য একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা
জকসুর কার্যালয়-সংকটটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আলোচনা তৈরি করেছে। ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান বলেন, “জকসুর জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু একটি প্রতিনিধি পরিষদ নয়, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্র। শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে সমস্যা জানাতে সুসংগঠিত অফিস, সভাকক্ষ ও প্রশাসনিক সহায়তা থাকা জরুরি।”

অন্যদিকে, সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী চয়ন শিকদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “বৃত্তি ও জকসুর জন্য আন্দোলন করেছিলাম সবাই, জকসু তো হয়ে গেল। বৃত্তির কী খবর? ৭ তারিখের মধ্যে তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল? যাদেরকে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করেছে, এবার আপনাদের পালা। অতিদ্রুত বৃত্তি বাস্তবায়ন করুন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই আপনাদের প্রথম কাজ হতে হবে।” তার এই মন্তব্য নির্বাচিতদের ওপর শিক্ষার্থীদের উচ্চ প্রত্যাশা এবং কার্যালয় সংকটের কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণে সম্ভাব্য বিলম্বের ইঙ্গিত দেয়।

প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি: “ব্যবস্থা করা হবে”
উপাচার্য মো. রেজাউল করিম এই বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, “যেহেতু এটি প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন, তাই তাদের জন্য পূর্বনির্ধারিত বসার কোনো স্থান নেই। আমরা নতুন করে তাদের বসার ব্যবস্থা করব। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে আমরা সবাই বসে তাদের জন্য অবকাশ ভবন কিংবা অন্য কোনো জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা যায়, সেটা দেখব।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, জকসু নির্বাচনের পরপরই অফিস স্পেস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্যাম্পাসে জায়গার সংকট থাকলেও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে অস্থায়ী কক্ষ বরাদ্দ দিয়ে পরে স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া হবে।

নির্বাচন সম্পন্ন হলেও জকসুর কার্যকর যাত্রা এখন অনেকটাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কোথায় বসবেন, এই প্রশ্নের দ্রুত সমাধান না হলে জকসুর ভূমিকা শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নতুন এই অধ্যায়ের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত একটি স্থায়ী ও সুসংগঠিত কার্যালয় নিশ্চিত করা এখন কর্তৃপক্ষের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts