.
অর্থনীতি

বাধ্যতামূলক ই-রিটার্নে জট পাকিয়ে বিপাকে করদাতারা: সহায়তা বুথেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সাড়া

Email :22

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩৮ বৃহস্পতিবার শীতকাল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বছর প্রথমবারের মতো সকল করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এটি একটি বড় পদক্ষেপ হলেও, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে সাধারণ করদাতাদের মধ্যে চরম ভোগান্তি ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক এবং মফস্বল এলাকার করদাতারা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে। অন্যদিকে, করদাতাদের সহায়তার জন্য খোলা ‘হেল্প ডেস্ক’ বা বুথগুলোতেও মিলছে না প্রত্যাশিত সেবা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনফাইল ছবি

প্রযুক্তিভীতি ও প্রবীণদের ভোগান্তি
চিরাচরিত পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করদাতারা হঠাৎ করে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। উত্তরার ষাটোর্ধ্ব ব্যবসায়ী মকবুল হাসানের অভিজ্ঞতাই এর বড় প্রমাণ। প্রতিবছর তিনি সশরীরে কর কার্যালয়ে গিয়ে রিটার্ন জমা দিতেন, যা ছিল তাঁর জন্য স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এবার নিয়ম বদলে যাওয়ায় তিনি দিশেহারা।

মকবুল হাসান আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারা জীবন কাগজে-কলমে হিসাব দিয়ে এসেছি। এখন বলা হচ্ছে অনলাইনে দিতে হবে। কিন্তু মাউস-কিবোর্ড বা স্মার্টফোনের জটিল ফাংশন আমার জানা নেই। পরিবারের কম বয়সীরা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও আয়করের জটিল বিষয়গুলো তারা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না।’ তিনি মনে করেন, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা শিথিলতা বা বিকল্প ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল। মকবুল হাসানের মতো শত শত প্রবীণ করদাতা এখন একই ধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

সরেজমিন চিত্র: জনশূন্য সহায়তা বুথ
এনবিআর ঘোষণা দিয়েছিল, করদাতাদের ভোগান্তি কমাতে প্রতিটি কর অঞ্চলে ‘ই-রিটার্ন সহায়তা বুথ’ চালু থাকবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। আজ রোববার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচার কর অঞ্চল-১১ এবং আশপাশের কয়েকটি কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে এক অদ্ভুত দৃশ্য।

রিটার্ন জমার মৌসুম মানেই কর কার্যালয়ে দীর্ঘ লাইন ও কোলাহল—এই পরিচিত দৃশ্য এবার অনুপস্থিত। বেলা ১১টার দিকে কর অঞ্চল-১১-এর সহায়তা বুথে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ারগুলো ফাঁকা। সেবা নেওয়ার জন্য কোনো করদাতা সেখানে উপস্থিত নেই। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কয়েকটি বুথে সহায়তাকারী কোনো কর্মকর্তাকেও পাওয়া যায়নি। পাশের ডেস্কে দায়িত্বরত এক কর্মী জানান, ই-রিটার্ন বুথের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছুটিতে আছেন। ফলে যেটুকু সহায়তার আশা ছিল, তাও ভেস্তে যাচ্ছে অব্যবস্থাপনায়।

ই-রিটার্ন জমার প্রক্রিয়া ও শর্তাবলী
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সহায়তা বুথ থেকে সেবা নিতে হলে করদাতাকে অবশ্যই কিছু নির্দিষ্ট নথিপত্র সঙ্গে আনতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • আয়ের প্রমাণপত্র (ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা বেতনের সনদ)।
  • সদ্য তোলা ছবি।
  • ই-টিআইএন (E-TIN) সনদের ফটোকপি।
  • আয়ের সপক্ষে অন্যান্য দলিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, করদাতার নিজের নামে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত সিম কার্ড থাকতে হবে। কারণ, অনলাইনে নিবন্ধনের সময় ওটিপি (OTP) যাচাইয়ের জন্য এটি অপরিহার্য। নিজের এনআইডি দিয়ে কেনা সিম না থাকলে অনলাইনে রিটার্ন সাবমিট করা সম্ভব হচ্ছে না, যা অনেক করদাতার জন্য নতুন বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত
কর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতভাগ অনলাইনে রিটার্ন জমা নেওয়ার উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়নে আরও সময়ের প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের করদাতাদের প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি, কর কার্যালয়ের সহায়তা বুথগুলোকে আরও সক্রিয় ও প্রচারমুখী করা না গেলে এই উদ্যোগ সফল করা চ্যালেঞ্জিং হবে।

আপাতত এনবিআরের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে (etaxnbr.gov.bd) গিয়ে নিবন্ধন ও পাসওয়ার্ড সেট করে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিভীতি কাটাতে এবং বুথগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এবারের কর মৌসুমে বড় ধরনের জটিলতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts