১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৪:২৩ বুধবার বসন্তকাল
ঐতিহ্যের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে এবারও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া ৪৯তম এই বইমেলায় বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মূলত ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বা অনুমতি না মেলায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেলা কর্তৃপক্ষ।
গত বুধবার (দিল্লিতে) আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারিয়ানো অগাস্টিন কচিনোর বাসভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, প্রতিবেশী দেশটিতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। যদিও কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন মেলায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়।

ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেন, “ডেপুটি হাইকমিশনকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেলায় অংশ নিতে হলে তাঁদের দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি আনতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁরা সেই অনুমতিপত্র গিল্ডের কাছে পেশ করতে পারেননি। আমরা এখনো সেই অনুমতির অপেক্ষাতেই আছি।” অনুমতি পাওয়া গেলে বাংলাদেশকে জায়গা দিতে গিল্ডের কোনো আপত্তি নেই বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯6 সাল থেকে নিয়মিতভাবে কলকাতা বইমেলায় অংশ নিয়ে আসছিল বাংলাদেশ। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মেলায় বাংলাদেশের কোনো প্রকাশনা সংস্থার অংশগ্রহণের সুযোগ প্রায় নেই। এর আগের বছরেও জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রকাশনা অংশ নেয়নি।
ফোকাস কান্ট্রি আর্জেন্টিনা ও রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষী সম্পর্ক
এবারের বইমেলার ‘থিম কান্ট্রি’ বা ফোকাস দেশ নির্বাচিত হয়েছে আর্জেন্টিনা। সাংবাদিক সম্মেলনে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারিয়ানো অগাস্টিন কচিনো দুই দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর্জেন্টিনা সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
১৯২৪ সালে সমুদ্রপথে পেরু যাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে কবি আর্জেন্টিনায় নেমেছিলেন। সে সময় বুয়েনস এইরেসে তিনি বিখ্যাত লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন এবং সুস্থ হয়ে ১৯২৫ সালে দেশে ফেরেন। রাষ্ট্রদূত জানান, রবীন্দ্রনাথের সাথে আর্জেন্টিনার এই সম্পর্কের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে, যা এবারের মেলায় বিশেষভাবে উদ্যাপিত হবে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যা দুই দেশের সাহিত্যিক বাধনকে আরও দৃঢ় করেছে।
অন্যান্য আকর্ষণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
আগামী ২২ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এই মেলায় আর্জেন্টিনা ছাড়াও যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, স্পেন, পেরু, কোস্টারিকাসহ লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশ অংশ নেবে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য যেমন—দিল্লি, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার, ওড়িশা, তামিলনাড়ু, কেরালা ও মহারাষ্ট্রের প্রকাশকরাও থাকছেন।
এবারের মেলায় বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কিংবদন্তিদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে। বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ‘বাংলা সিনেমা ও মহানায়ক’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী, সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা এবং সুরকার সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষও যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হবে।
সব মিলিয়ে জমজমাট আয়োজনের প্রস্তুতি থাকলেও, প্রতিবেশী বাংলাদেশের অনুপস্থিতি বইপ্রেমীদের মনে খানিকটা শূন্যতা তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Analysis | Habibur Rahman