১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৬ সোমবার বসন্তকাল
৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের পর অবশেষে ঢাকার বুকে উড়ল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। বিশ্ব দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—যেখানে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জনসমক্ষে মাথা নিচু করে পরাজয় মেনে নিল।
বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি এবং মিত্রবাহিনীর (যৌথ বাহিনী) পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। এই মুহূর্তটি কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং একটি স্বাধীন জাতির অভ্যুদয়ের দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।
পাঞ্জাবের দুই জেনারেলের মুখোমুখি অবস্থান
ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমাপতন দেখা গেল রেসকোর্সের টেবিলে। বিজয়ী এবং বিজিত—উভয় পক্ষের প্রধান সেনাপতির জন্মই ছিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবে। মিত্রবাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং অরোরার জন্ম ব্রিটিশ ভারতের ঝিলাম জেলার কালা গুজরাতে, অন্যদিকে পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজির জন্ম মিয়াওয়ালিতে। তবে ১৬ই ডিসেম্বরের বিকেলে তাদের নিয়তি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিয়াজি যখন কাঁপা হাতে পরাজয়ের দলিলে সই করছিলেন, তখন তার চোখেমুখে ছিল রাজ্যের গ্লানি।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে স্বাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জে.এফ.আর. জ্যাকব, সাগাত সিং এবং হরি চাঁদ দেওয়ান। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ এবং এয়ার কমডোর প্যাট্রিক ডেসমন্ড ক্যালাগান, যারা নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষে পরাজয় মেনে নেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
৯৩ হাজার সেনার অস্ত্র সংবরণ
এই আত্মসমর্পণ ছিল আধুনিক সামরিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। সরকারি তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সদস্য মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্যে ৭৯,৬৭৬ জন ছিলেন ইউনিফর্মধারী নিয়মিত সেনাসদস্য। বাকিরা ছিল নৌ, বিমান এবং বিভিন্ন পরামিলিটারি বাহিনীর সদস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বিশাল সংখ্যক সৈন্যের একত্রে আত্মসমর্পণের ঘটনা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই বিশাল বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানি জান্তারা মেনে নেয় যে, পূর্ব পাকিস্তান এখন স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’।
Analysis | Habibur Rahman

