১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩৯ বৃহস্পতিবার শীতকাল
বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়া বা ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাবে অল্প বয়সেই শরীরে বাসা বাঁধছে ক্লান্তি ও স্থূলতা। সম্প্রতি ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর ওজন বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ঘুম বা ক্লান্তিবোধের সমস্যার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন দেশের খ্যাতনামা হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ।

ল্যাবএইড লিমিটেড (ডায়াগনস্টিক)-এর ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. ফিরোজ আমিন এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ওজন কি আসলেই বেশি?
অনেকেই নিজের ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন, কিন্তু আদতে সেটি ভয়ের কারণ কি না, তা বুঝতে হলে উচ্চতার দিকে নজর দিতে হবে। ডা. ফিরোজ আমিনের মতে, ওজন ৬৯ কেজি—এটি শুনলে বেশি মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ওই ব্যক্তির উচ্চতার ওপর। তাই দুশ্চিন্তা করার আগে উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন (Ideal Body Weight) নির্ণয় করা জরুরি।
ক্যালোরির হিসাব ও আমাদের ভুল ধারণা
ওজন কেন বাড়ে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না এবং দিনের বড় একটা সময় বসে বা শুয়ে কাটান, তাদের শারীরিক বৃত্তীয় কাজ সচল রাখতে দৈনিক মাত্র ৮০০ থেকে ১০০০ ক্যালরি প্রয়োজন হয়।
সমস্যা হলো, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে সকালের নাশতা এবং বেলা ১১টার হালকা খাবারেই এই ১০০০ ক্যালরি পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর দুপুরের ভারী খাবার, বিকেলের স্ন্যাকস এবং রাতের খাবার—সব মিলিয়ে শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ক্যালরি প্রবেশ করে। শরীর এই বাড়তি ক্যালরি খরচ করতে পারে না, ফলে তা চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে এবং ওজন বাড়ায়।
রাতের খাবার: ওজন কমানোর মূল চাবিকাঠি
ওজন নিয়ন্ত্রণে আনার জাদুকরী কৌশল লুকিয়ে আছে রাতের খাবারে। ডা. আমিনের পরামর্শ অনুযায়ী:
১. রাতের খাবার হতে হবে অত্যন্ত হালকা এবং পরিমাণে কম।
২. ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তে খাওয়া যাবে না। ঘুমানোর অন্তত চার ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করতে হবে। এতে হজম প্রক্রিয়া ভালো থাকে এবং চর্বি জমার সুযোগ কমে।
ব্যায়ামের সুনির্দিষ্ট নিয়ম: ১০ হাজার স্টেপ
শুধু ডায়েট করলেই হবে না, শরীর থেকে আলস্য দূর করতে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। তবে যেনতেনভাবে হাঁটলে কাজ হবে না। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে হাঁটার নিয়মগুলো হলো:
- পরিমাণ: প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজার কদম (Steps) অথবা ঘড়ি ধরে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট হাঁটতে হবে।
- গতি: হাঁটার গতি হতে হবে প্রতি সেকেন্ডে ২টি স্টেপ। অর্থাৎ দ্রুতলয়ে হাঁটতে হবে।
- স্থান: চার দেয়ালের ভেতর বা ট্রেডমিলে না হেঁটে খোলা আকাশ বা পার্কের নিচে হাঁটা বেশি ফলপ্রসূ। এতে মানসিক প্রফুল্লতা বাড়ে এবং ক্লান্তি কমে।
এভাবে নিয়ম মেনে চললে মাসে ২ থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত ওজন কমানো সম্ভব, যা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ।
ক্লান্তি কেন কাটছে না?
কলেজ থেকে ফিরে ৩-৪ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও ক্লান্তি না কাটার প্রধান কারণ হতে পারে শারীরিক সক্রিয়তার অভাব। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস না থাকলে শরীর অল্পতেই কাহিল হয়ে পড়ে। খোলা পরিবেশে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি শুরু করলে শরীরের মেটাবলিজম বাড়বে এবং এই অলসতা ও ক্লান্তি ধীরে ধীরে কেটে যাবে।
প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা
জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু শারীরিক জটিলতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. ফিরোজ আমিন। বিশেষ করে নিচের পরীক্ষাগুলো করিয়ে নেওয়া জরুরি:
- থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা।
- ডায়াবেটিস আছে কি না।
- রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ।
- লিভারে ফ্যাট বা চর্বি জমেছে কি না (ফ্যাটি লিভার)।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত হাঁটা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অল্প বয়সেই ওজন ও ক্লান্তি—উভয় সমস্যা থেকেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
Analysis | Habibur Rahman