১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:৩৫ সোমবার বসন্তকাল
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যাচাই-বাছাই পর্বে হোঁচট খেলেন ঢাকা-৯ আসনের আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের তালিকায় ‘অসংগতি’ থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে এই সিদ্ধান্তের দ্বিমত পোষণ করে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক এই নেত্রী। ইতোমধ্যেই আপিল প্রক্রিয়ার কাজ শুরু করেছেন বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।

ছবি: তাসনিম জারার ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া
শনিবার (আজ) দুপুরে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেন তাসনিম জারার প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বাতিলের কারণ ও কমিশনের বক্তব্য
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের জন্য মোট ভোটারের ১ শতাংশের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ঢাকা-৯ আসনের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ছিল ৪ হাজার ৩০০ জন। তাসনিম জারা জমা দিয়েছিলেন প্রায় ৫ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর।
নিয়ম অনুযায়ী, জমা দেওয়া তালিকা থেকে দৈবচয়ন (র্যান্ডম স্যাম্পলিং) পদ্ধতিতে ১০ জন ভোটারের তথ্য যাচাই করে নির্বাচন কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেন জানান, যাচাইকৃত ১০ জনের মধ্যে ৮ জনের তথ্য সঠিক পাওয়া গেলেও বাকি দুজনের ক্ষেত্রে গরমিল পরিলক্ষিত হয়। কমিশনের ডেটাবেজ অনুযায়ী, ওই দুজন ঢাকা-৯ আসনের ভোটার নন। নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী ১০ জনের তথ্যে শতভাগ সত্যতা না মেলায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তবে তিনি জানান, সংক্ষুব্ধ প্রার্থীর আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
তাসনিম জারার ব্যাখ্যা ও আপিল প্রসঙ্গ
মনোনয়নপত্র বাতিলের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজ থেকে একটি ভিডিও বার্তা দেন তাসনিম জারা। সেখানে তিনি দাবি করেন, যে দুজনের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেটি মূলত ভোটারদের অজ্ঞতা ও টেকনিক্যাল বিভ্রান্তির ফসল।
তাসনিম জারা জানান, যে দুই ব্যক্তির তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে, তারা নিজেরাও জানতেন না যে তারা ঢাকা-৯ আসনের ভোটার নন। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘একজন স্বাক্ষরকারীর বাসা খিলগাঁও এলাকায়। খিলগাঁও থানাটি ঢাকা-৯ এবং ঢাকা-১১—উভয় আসনের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ওই ভোটার জানতেন তিনি ঢাকা-৯ এর অংশ, তাই তিনি সরল বিশ্বাসে স্বাক্ষর করেছিলেন।’’
অন্য ব্যক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘দ্বিতীয় ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) তার ঠিকানা ঢাকা-৯ আসনেই উল্লেখ রয়েছে। তিনি কয়েক বছর আগে ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য শরীয়তপুরে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সেটির কোনো আপডেট বা নিশ্চিতকরণ বার্তা তিনি পাননি। ফলে তিনি জানতেন তিনি এখনো ঢাকার ভোটার। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অনলাইন সার্ভারে তাকে শরীয়তপুরের ভোটার হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই অভ্যন্তরীণ তথ্য জানার কোনো উপায় নেই।’’
ভিডিও বার্তায় তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।
স্বামীর বক্তব্য ও আইনি প্রস্তুতি
তাসনিম জারার স্বামী ও তার নির্বাচনী প্রচারণার সমন্বয়ক খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, যে দুই ভোটারের তথ্য নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তারা বিষয়টি পরিষ্কার করে ইতোমধ্যে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমরা ৫ হাজার স্বাক্ষর জমা দিয়েছিলাম। মাত্র দুজন ভোটারের বিভ্রান্তির কারণে পুরো মনোনয়ন বাতিল হতে পারে না। আমরা পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসেই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ফাইল করব।’’
প্রেক্ষাপট: দল ত্যাগ ও স্বতন্ত্র লড়াই
উল্লেখ্য, ডা. তাসনিম জারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ছিলেন এবং দলটির পক্ষ থেকে ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে গত ২৮ ডিসেম্বর এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় গেলে, নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগের পর মাত্র দেড় দিনের ব্যবধানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৫ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ২৯ ডিসেম্বর সবুজবাগ থানা নির্বাচন কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। শেষ মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে নামা এই নবীন প্রার্থীর নির্বাচনী ভাগ্য এখন নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির ওপর।
Analysis | Habibur Rahman
