১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৯:০৫ বৃহস্পতিবার শীতকাল
সুন্দরবনের গহীনে হরিণ শিকারের জন্য চোরাশিকারিদের পাতা ফাঁদ, আর সেই ফাঁদেই পা দিয়ে বিপদ ডেকে এনেছিল বনের রাজা। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর অবশেষে বন বিভাগের তৎপরতায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ফাঁদে আটকা পড়া ওই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটিকে। বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মধ্যবর্তী বনাঞ্চল থেকে রোববার (আজ) দুপুরে বাঘটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য খুলনায় পাঠানো হয়েছে।

যেভাবে আটকা পড়ল বাঘটি
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন একটি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। লোকালয় ও সুন্দরবনকে পৃথক করা ‘শরকির খাল’ দিয়ে বনের প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে চোরাশিকারিরা হরিণ ধরার জন্য নাইলনের দড়ির ফাঁদ পেতেছিল। শনিবার দুপুরের পর বনকর্মীরা খবর পান, দুর্ভাগ্যবশত সেই ফাঁদে আটকা পড়েছে একটি বাঘ। বাঘটি নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সেখানেই দীর্ঘক্ষণ আটকা ছিল।
উদ্ধার অভিযানের আদ্যোপান্ত
শনিবার বিকেলেই বন বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাঘটির অবস্থান নিশ্চিত করেন এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেন। তবে বাঘটি জীবিত ও হিংস্র অবস্থায় থাকায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। খবর পাঠানো হয় ঢাকায়। বাঘটিকে নিরাপদে উদ্ধারের লক্ষ্যে ঢাকা থেকে ভেটেরিনারি সার্জনসহ একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং খুলনা থেকে বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা আজ সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বাঘটিকে চেতনানাশক (ট্রানকুইলাইজার) প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। বন বিভাগের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৎস্য বিশেষজ্ঞ এবং স্মার্ট ডেটা কো-অর্ডিনেটর মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, রোববার বেলা আড়াইটার দিকে বাঘটির শরীরে সফলভাবে চেতনানাশক ইনজেকশন পুশ করা হয়। বাঘটি অচেতন হয়ে পড়ার পর বেলা ২টা ৫০ মিনিটের দিকে তাকে ফাঁদ থেকে মুক্ত করে খাঁচাবন্দী করা হয়।
বাঘের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা
দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে ছটফট করার কারণে বাঘটি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, উদ্ধারের পরপরই বাঘটির শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বনের ভেতরে বাঘটির পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সম্ভব নয়। তাই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় অবস্থিত বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা শেষে বাঘটির শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উৎসুক জনতার ভিড় ও বিড়ম্বনা
বাঘ আটকা পড়ার খবরটি শনিবার সন্ধ্যা থেকেই লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই মোংলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি এলাকার হাজার হাজার মানুষ বাঘটিকে একনজর দেখার জন্য ভিড় জমাতে শুরু করে। বন বিভাগের কড়া নিষেধাজ্ঞা ও বাধা উপেক্ষা করে আজ রোববার সকাল থেকেই উৎসুক জনতা বনের গহীনে প্রবেশ করতে থাকে। এমনকি উদ্ধার অভিযান শুরুর আগেই কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে বাঘটির ভিডিও ধারণ ও ছবি তোলার চেষ্টা করে।
দুপুরের দিকে শরকির খালের পাড়ে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। উদ্ধারকারী দল যখন খাঁচাবন্দী বাঘটিকে নিয়ে বনের বাইরে আসছিল, তখন এই বিপুল জনসমাগমের কারণে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। ভিড় সামলে দ্রুততম সময়ে বাঘটিকে নিয়ে বনকর্মীরা মোংলা হয়ে খুলনার উদ্দেশে রওনা হন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী রক্ষায় টহল জোরদার করা হয়েছে এবং চোরাশিকারিদের পাতা এমন আরও ফাঁদ আছে কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।
Analysis | Habibur Rahman