১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৩৫ বৃহস্পতিবার শীতকাল
রাজধানীর আলোচিত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলমগীর শেখ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা বর্তমানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থান করছেন। এদিকে, এই পলায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার অভিযোগে মেঘালয় পুলিশ পূর্তি ও সামী নামের দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে।

আজ রোববার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ঘাতকরা আগে থেকেই পলায়নের ছক কষে রেখেছিল।
পলায়নের রোমহর্ষক রুট: ঢাকা থেকে তুরা
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই ফয়সাল ও আলমগীর দ্রুত ঢাকা ত্যাগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। প্রথমে তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে আমিনবাজার পৌঁছান। সেখান থেকে গাড়ি পরিবর্তন করে কালামপুর হয়ে সোজা চলে যান ময়মনসিংহ সীমান্তে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় ফিলিপ পাল ও সঞ্জয় নামের দুই ব্যক্তি তাদের অপেক্ষায় ছিলেন। এই দুজন মূলত সীমান্তে অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের কাজ করেন। তাদের সহায়তায় ফয়সাল ও আলমগীর অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করেন। মেঘালয়ের তুরা নামক স্থানে পৌঁছানোর পর ফিলিপ তাদের ভারতীয় নাগরিক ‘পূর্তি’-র কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে ‘সামী’ নামের আরেক ব্যক্তি নিজস্ব গাড়িতে করে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেন। মেঘালয় পুলিশ এই সহায়তা করার অপরাধেই পূর্তি ও সামীকে গ্রেপ্তার করেছে।
তদন্ত প্রায় শেষ, সপ্তাহেই চার্জশিট
ডিএমপি জানিয়েছে, হাদি হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখন শেষ পর্যায়ে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং ৪ জন সাক্ষীও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জবানবন্দি প্রদান করেছেন। অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম জানান, আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও নেপথ্যের কারিগর
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “প্রাথমিক তদন্ত ও প্রাপ্ত তথ্যে এটি একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা অনেককেই আমরা শনাক্ত করেছি। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।”
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোতে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় ১২৭ কোটি টাকার লেনদেনের হদিস পাওয়ায় তার ব্যাংক হিসাবটি অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে।
শোক ও প্রতিবাদ: ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি
গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গত রোববার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়।
হাদি হত্যার বিচার ও খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে আজ রোববার বেলা ২টা থেকে সারা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ‘সর্বাত্মক অবরোধ’ কর্মসূচি পালন করছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের জানান, ডিএমপির সংবাদ সম্মেলনের তথ্য পর্যালোচনার পর তারা কর্মসূচির সময় পরিবর্তন করে দুপুর ২টায় নির্ধারণ করেছেন। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
Analysis | Habibur Rahman