১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রবেশমুখ ও সংযোগস্থল—সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় এবং মিরপুরের টেকনিক্যাল মোড় আবারও অবরুদ্ধ করে রেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাদেশ জারির দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে এই অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। এর ফলে সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে রাজধানী জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

দাবি আদায়ে রাজপথে শিক্ষার্থীরা
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে একটি বিশাল মিছিল বের করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এই কর্মসূচিতে ঢাকা কলেজ ছাড়াও ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ এবং তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘রাষ্ট্র তোমার সময় শেষ, জারি করো অধ্যাদেশ’, এবং ‘আমি কে তুমি কে, ডিসিইউ ডিসিইউ’। কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফারুক হাসান আন্দোলনের লক্ষ্য স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘আমাদের দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার—অবিলম্বে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। আমরা আর কালক্ষেপণ মেনে নেব না।’’
একই সময়ে মিরপুরের টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করেন সরকারি বাঙলা কলেজসহ মিরপুর এলাকার সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর ফলে গাবতলী থেকে ঢাকার ভেতরে প্রবেশের পথ এবং মিরপুর ১, ২ ও ১০ নম্বরের সড়কগুলোতে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।
জনদুর্ভোগ ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
শিক্ষার্থীদের এই অবরোধের কারণে মিরপুর রোড, সায়েন্স ল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় হাজার হাজার মানুষকে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা যায়। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিক, শিশু এবং রোগীদের নিয়ে বিপাকে পড়েন স্বজনরা।
সাভার থেকে গুলিস্তানগামী যাত্রী মো. হানিফ সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আটকে পড়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘‘মানুষের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? যার যখন খুশি রাস্তা আটকাচ্ছে। দাবি আদায়ের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। দেশে কি কোনো সরকার নেই? থাকলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি নিরসনে তাদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’’
ধারাবাহিক আন্দোলন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গত বুধবারও সায়েন্স ল্যাব, টেকনিক্যাল এবং পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে দিনভর অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। এমনকি অল্প সময়ের জন্য মহাখালীতেও রাস্তা বন্ধ করা হয়েছিল। গতকালের সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আজ আবারও রাজপথে নামেন তাঁরা।
অন্যদিকে, তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকাল সহপাঠী হত্যার বিচার চেয়ে ফার্মগেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছিলেন, যা রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশের একটি পরিমার্জিত খসড়া গত মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রক্রিয়া অনুযায়ী, এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নীতিগত সম্মতি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং (আইনি যাচাই-বাছাই) শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থাপন করা হবে।
সংকটের প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়াই ঢাকার সাতটি বড় কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই সেশন জট, ফলাফল প্রকাশে বিলম্বসহ নানা প্রশাসনিক জটিলতায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। এই সংকট নিরসনে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সরকার ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ গঠনের উদ্যোগ নিলেও, এর খসড়া অধ্যাদেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। নতুন খসড়ায় কলেজগুলোর নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে (অনেকটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে) কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ জারির দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
Analysis | Habibur Rahman