.
আন্তর্জাতিক

শ্রমবাজারে ধেয়ে আসছে এআই ‘সুনামি’: তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় অশনিসংকেত দিল আইএমএফ

Email :14

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার যখন মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করছে, ঠিক তখনই শ্রমবাজারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা শোনালেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) শ্রমবাজারে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে একটি বিধ্বংসী ‘সুনামি’র মতো। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হবে বর্তমান বিশ্বের তরুণ প্রজন্মকে।

আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাছবি: এএফপি

ঝুঁকির মুখে ৬০ শতাংশ চাকরি
আইএমএফ-এর নিজস্ব গবেষণার উপাত্ত তুলে ধরে জর্জিয়েভা জানান, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে এআই-এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এসব দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাপী এই হার হতে পারে প্রায় ৪০ শতাংশ।

জর্জিয়েভা ব্যাখ্যা করেন, এআই-এর প্রভাবে চাকরির বাজারে দ্বিমুখী স্রোত তৈরি হবে। কিছু চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, আবার কিছু চাকরির ধরন আমূল পরিবর্তিত হবে। উন্নত দেশগুলোতে ইতোমধ্যেই প্রতি ১০টি চাকরির মধ্যে অন্তত একটিতে এআই ব্যবহারের ফলে কাজের মান উন্নত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন বেড়েছে। এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে—যেসব ক্ষেত্রে এআই সরাসরি মানুষের জায়গা নিচ্ছে না, সেখানেও উৎপাদনশীলতা না বাড়লে কর্মীদের মজুরি কমে যাওয়ার বা ছাঁটাইয়ের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

তরুণ ও মধ্যবিত্তের সংকট
আইএমএফ প্রধানের মতে, এই প্রযুক্তির বিপ্লবে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়বে তরুণেরা। কারণ, তারাই শ্রমবাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে বা সবে প্রবেশ করেছে। এআই-এর বিশাল ঢেউ সামলানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শুধু তাই নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা ‘মিডল ক্লাস’-এর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। জর্জিয়েভা সতর্ক করেন যে, এআই-এর সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলে মধ্যবিত্তের আয়ের পথ সংকুচিত হতে পারে।

প্রযুক্তির গতির কাছে অসহায় নীতিনির্ধারণ
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা তার বক্তব্যে এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটিও চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো নীতিমালা বা রেগুলেশন সেই গতিতে এগোচ্ছে না। প্রযুক্তিটি কীভাবে নিরাপদ ও সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়, সে বিষয়ে বিশ্বনেতারা এখনো ধোঁয়াশায় আছেন। তিনি স্বীকার করেন, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ব এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে।

বাণিজ্যিক মুনাফা বনাম মানবিক বিপর্যয়
সম্মেলনে এআই-এর বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে কথা বলেন ইউএনআই গ্লোবাল ইউনিয়নের মহাসচিব ক্রিস্টি হফম্যান। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত খরচ কমাতে এবং উৎপাদন বাড়াতে এআই ব্যবহার করছে, যার অনিবার্য পরিণতি হলো কর্মী ছাঁটাই।

হফম্যান মন্তব্য করেন, এআই-এর অগ্রগতি থামানো উচিত নয়, তবে এটি যেন সাধারণ মানুষের ওপর ‘বুলডোজার’-এর মতো চেপে না বসে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থনীতির সুফল যেন গুটিকয়েক মানুষের হাতে জিম্মি না হয়ে সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

একই সুরে কথা বলেছেন মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলা। তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই-এর সুবিধা যদি কেবল বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কুক্ষিগত থাকে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তবে সমাজ এই প্রযুক্তিকে মেনে নেবে না। বিশেষ করে জ্বালানি ও সম্পদের অসম প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ভূ-রাজনীতি ও এআই-এর ভবিষ্যৎ
প্যানেল আলোচনায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এআই-এর বিকাশের জন্য বিপুল পরিমাণ পুঁজি, জ্বালানি এবং তথ্যের (Data) প্রয়োজন। কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির শুল্ক বাধার কারণে এই চেইনটি ভেঙে পড়তে পারে। ল্যাগার্ডের মতে, দেশগুলো যদি সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং নতুন নিয়ম না মানে, তবে এআই-এর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং বিশ্বব্যাপী বৈষম্য আরও গভীর হবে।

দাভোসের এই সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে আলোচনা হলেও, শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ এবং এআই-এর প্রভাবই ছিল নীতিনির্ধারকদের চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts