১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:২৫ সোমবার বসন্তকাল
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি রায় নয়াদিল্লির দরজায় কড়া নেড়েছে এক জটিল কূটনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর এখন ভারত এক নজিরবিহীন উভয়সঙ্কটে: দীর্ঘদিনের মিত্রকে রক্ষা করবে, নাকি প্রতিবেশী দেশের নতুন সরকারের ন্যায়বিচারের দাবিকে সম্মান জানাবে? এই রায়ের কালি শুকানোর আগেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি, যার ফলাফল নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।
রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকার বার্তা ছিল স্পষ্ট এবং কঠোর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রত্যর্পণ চুক্তিকে সামনে এনে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোকে ভারতের “বাধ্যতামূলক দায়িত্ব” হিসেবে অভিহিত করেছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কণ্ঠে ছিল প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, যেখানে তিনি হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়াকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “শত্রুতামূলক আচরণ” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এর বিপরীতে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত পরিমাপিত এবং সতর্ক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বিবৃতিটি ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের এক নিখুঁত উদাহরণ। বিবৃতিতে বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রতি ভারতের অঙ্গীকারের কথা বলা হলেও, মূল প্রশ্ন—প্রত্যর্পণ—সম্পর্কে অবলম্বন করা হয়েছে কৌশলগত নীরবতা। ভারত সরাসরি “হ্যাঁ” বা “না” কোনোটাই বলেনি, যা তাদের গভীর চিন্তাভাবনারই প্রতিফলন।
আনুষ্ঠানিক বিবৃতির আড়ালে নয়াদিল্লির অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানাচ্ছে, শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ভারতের এই অবস্থানের পেছনে কাজ করছে একাধিক ফ্যাক্টর। প্রথমত, ভারত এই বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখছে। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে এমন একটি দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান একটি বড় বাধা। সর্বোপরি, শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন একজন বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে, এবং তাকে পরিত্যাগ করা ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
যদিও বাংলাদেশ ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা বলছে, ভারত সেই চুক্তিরই একটি বিশেষ ধারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক প্রকৃতির বলে মনে করা হয়, তবে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার সংশ্লিষ্ট দেশের রয়েছে। শেখ হাসিনা নিজে এই রায়কে “রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে আখ্যা দিয়েছেন, যা ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এই মুহূর্তে বল নয়াদিল্লির কোর্টে। শেখ হাসিনার ছেলে সাজিব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত তাকে “রাষ্ট্রপ্রধানের মতো” নিরাপত্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারও তাদের দাবিতে অনড়। ভারত যদি হাসিনাকে আশ্রয় দেয়, তবে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর যদি তাকে ফেরত পাঠায়, তবে তা ভারতের জন্য মিত্রকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সুতরাং, এই সিদ্ধান্তটি কেবল আইনি বা মানবিক নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে চলেছে। এই একটি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দেবে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কি সহযোগিতার পথেই হাঁটবে, নাকি সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। celý світ এখন দিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে।
Analysis | Habibur Rahman


