১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৪৪ বুধবার বসন্তকাল
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারের দাবিতে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ মোড় অবরোধ করে সর্বাত্মক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। সংগঠনের পূর্বঘোষিত এই কর্মসূচির ফলে ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এই পয়েন্টে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রত্যাখ্যান করে রোববার দুপুর থেকে রাজপথ দখলে নেন আন্দোলনকারীরা।

সরেজমিন পরিস্থিতি ও অবরোধ
ইনকিলাব মঞ্চের ঘোষণা অনুযায়ী রোববার বেলা ২টা থেকে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, সকাল ১১টা থেকেই শাহবাগ এলাকায় জড়ো হতে থাকেন সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ মোড় ও এর আশপাশের এলাকায় জনসমাগম বাড়তে থাকে। ঠিক বেলা ২টার পর বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ মোড়ের মূল সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বসে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিতে থাকেন, ফলে শাহবাগকেন্দ্রিক সকল রুটে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
স্লোগানে প্রকম্পিত এলাকা
অবরোধ চলাকালে শাহবাগ এলাকা মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে। নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে ছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। এ সময় তাঁরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’ এবং ‘হাদি না মোদি, হাদি হাদি’—এমন নানা স্লোগান দিতে থাকেন। ‘যেই হাদি জনতার, সেই হাদি মরে না’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রশাসনের আশ্বাসে অনাস্থা ও নতুন কর্মসূচি
এর আগে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে গত শুক্রবার দুপুর থেকে শাহবাগে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিল ইনকিলাব মঞ্চ। শনিবার রাতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী শাহবাগে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা জানান, আগামী ৭ জানুয়ারির মধ্যে হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
তবে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের প্রশাসনের এই সময়সীমাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মৌখিক আশ্বাসে আস্থা না রেখে আন্দোলন আরও বেগবান করতে তিনি ঢাকাসহ দেশের সকল বিভাগীয় শহরে সর্বাত্মক অবরোধের ডাক দেন। এরই অংশ হিসেবে রোববার শাহবাগে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়।
পুলিশের তদন্ত ও আসামিদের পলায়ন
এদিকে রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নতুন তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাদের পালাতে সহায়তা করার অভিযোগে ভারতের মেঘালয় পুলিশ দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে।
প্রেক্ষাপট: কে ছিলেন ওসমান হাদি?
শরিফ ওসমান হাদি গত বছরের আগস্টে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গঠন করে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাজপথের পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রচারণাও চালাচ্ছিলেন তিনি। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন হাদি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে বিচার চেয়ে আসছে ইনকিলাব মঞ্চ।
Analysis | Habibur Rahman