.
জাতীয়

রাষ্ট্রীয় নির্দেশেও আর বন্ধ করা যাবে না ইন্টারনেট, আড়িপাতা ও নজরদারি দণ্ডনীয় অপরাধ: টেলিযোগাযোগ আইনে আসছে আমূল পরিবর্তন

Email :20

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ১:০৮ বৃহস্পতিবার শীতকাল

নাগরিকদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন থেকে চাইলেই আর হুট করে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ করা যাবে না। পাশাপাশি, গ্রাহকের সিম বা ডিভাইসের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে নজরদারি বা আড়িপাতার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে নতুন আইনি সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে।

বুধবার (২০ নভেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে টেলিযোগাযোগ খাতের সংস্কারে একগুচ্ছ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকছবি: পিআইডি

ইন্টারনেট শাটডাউন ও নজরদারি বন্ধে আইনি সুরক্ষা
বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সংশোধিত অধ্যাদেশে স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে যে, ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা কখনোই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যাবে না। অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ভিন্নমতের দমনে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের যে সংস্কৃতি ছিল, তা রোধেই এই ব্যবস্থা।

নতুন অধ্যাদেশে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতদিন সিম রেজিস্ট্রেশন বা ডিভাইসের আইএমইআই (IMEI) তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নজরদারি বা হয়রানি করার যে অভিযোগ ছিল, তা এখন থেকে ‘আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে।

বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা ও ‘স্পিচ অফেন্স’
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেলিযোগাযোগ আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। খসড়ায় বিতর্কিত ‘স্পিচ অফেন্স’ বা কথাবার্তা সংক্রান্ত নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, অনলাইনে মতপ্রকাশের জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না, তবে কেবল ‘সহিংসতার আহ্বান’ জানালে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া টেলিযোগাযোগ সেবার বিরোধ নিষ্পত্তিতে আপিল ও সালিস বিষয়ক নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

বিটিআরসি’র স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য
বিগত সরকারের আমলে ২০১০ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনেক ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে সেই কাঠামো ভেঙে কমিশনের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

খসড়া অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি’র কার্যপরিধির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য আনা হয়েছে। এতদিন সব ধরনের লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলেও, এখন থেকে কেবল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাইসেন্স—যা ইনডিপেনডেন্ট স্টাডির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে—তা মন্ত্রণালয় অনুমোদন করবে। বাকি সব ধরনের লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের এখতিয়ার বিটিআরসি’র কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও গণশুনানি
টেলিযোগাযোগ খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি ‘জবাবদিহি কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, বিটিআরসি যাতে স্বেচ্ছাচারী না হতে পারে, সেজন্য এখন থেকে প্রতি চার মাস অন্তর বাধ্যতামূলক গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। শুনানির ফলাফল এবং পরবর্তী পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়মিত কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে নতুন এই অধ্যাদেশে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটবে এবং সাধারণ গ্রাহকদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts