.
বাংলাদেশ

রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উত্তপ্ত হাতিয়ার ‘জাগলার চর’: বাহিনী প্রধান শামছুর মরদেহ মিলল বনে, মোট প্রাণহানি ৬

Email :38

১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:১০ বুধবার বসন্তকাল

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত দুর্গম ‘জাগলার চরের’ দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ত্রিমুখী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়ে। সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, সংঘর্ষের অন্যতম মূল হোতা এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘শামছু বাহিনী’র প্রধান শামছুদ্দিন ওরফে ‘কোপা শামছু’র (৫৫) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চরের গহীন বনাঞ্চল থেকে শামছুদ্দিনের মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। তিনি হাতিয়া উপজেলার জাহাজমারা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন।

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা থানায় নিয়ে আসার কাজ চলছে।

যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ ও নিহতের তালিকা
গত মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) চরের দখল নিয়ে বিবদমান তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই দিনই পুলিশ ও স্থানীয়রা মিলে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করেছিল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন প্রতিপক্ষ ‘আলাউদ্দিন বাহিনী’র প্রধান আলাউদ্দিন, শামছুদ্দিনের ছেলে মোবারক হোসেন, এবং তাদের সহযোগী আবুল কাশেম, হক সাব ও কামাল উদ্দিন।

নিখোঁজ ছিলেন বাহিনী প্রধান শামছুদ্দিন। আজ সন্ধ্যায় বনের ভেতরে তার মরদেহ পাওয়ার মধ্য দিয়ে এই সংঘর্ষে দুই বাহিনী প্রধানসহ মোট ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেল। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত অন্য পাঁচজনের ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার রাতেই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সংঘাতের নেপথ্যে চরের ‘জমি বাণিজ্য’
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন এই ‘জাগলার চর’ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে। স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী চরের খাসজমি নিজেদের দখলে নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করার এক অবৈধ ‘বাণিজ্য’ শুরু করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথমে জাহাজমারা ইউনিয়নের ‘কোপা শামছু’ বাহিনী চরের জমি দখল শুরু করে। এরপর সুখচর ইউনিয়নের ‘আলাউদ্দিন বাহিনী’ও একই কায়দায় চরে ঘাঁটি গেড়ে একরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দরে সরকারি জমি বিক্রি শুরু করে। আধিপত্যের এই লড়াইয়ে কয়েক মাস আগে যুক্ত হয় ‘ফরিদ কমান্ডার’ নামের আরেকটি বাহিনী।

তিনটি বাহিনীর মধ্যে জমি দখলের প্রতিযোগিতা একপর্যায়ে মরণপণ যুদ্ধে রূপ নেয়। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে গত মঙ্গলবারের সংঘর্ষে দুই বাহিনী প্রধানসহ ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল।

মামলা ও পুলিশি তৎপরতা
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকালে হাতিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত শামছুদ্দিনের ছোট ভাই আবুল বাশার বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এজাহারে সুনির্দিষ্টভাবে ৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ১০ থেকে ১২ জনকে।

তবে, সংঘর্ষে নিহত অপর বাহিনী প্রধান আলাউদ্দিনের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হাতিয়া থানার ওসি মো. সাইফুল আলম বলেন, “আমরা হত্যা মামলাটি রেকর্ড করেছি। এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts