.
আন্তর্জাতিক

যুক্তরাজ্যে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ‘অতিদরিদ্র’ মানুষ: বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

Email :18

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল

বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। বিগত ৩০ বছরের ইতিহাসে দেশটিতে ‘অতিদরিদ্র’ বা চরম দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এই হার উদ্বেগজনক, যার মধ্যে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতরাই সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন’ (জেআরএফ)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

চরম দারিদ্র্যের নতুন রেকর্ড
গবেষণার তথ্যমতে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ ‘অতিদারিদ্র্যের’ (Destitution) মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। গবেষণাটিতে ‘অতিদরিদ্র’ বলতে এমন পরিবারগুলোকে বোঝানো হয়েছে, যাদের বাসাভাড়া ও আবাসন খরচ মেটানোর পর হাতে থাকা অর্থ যুক্তরাজ্যের গড় আয়ের (Median Income) ৪০ শতাংশেরও কম। উদাহরণস্বরূপ, দুই সন্তানসহ একটি দম্পতির ক্ষেত্রে এই আয় বছরে ১৬ হাজার ৪০০ পাউন্ড বা তার নিচে হলে তাদের এই ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ১৯৯৪-৯৫ সালের তুলনায় ২০২৩-২৪ সালে যুক্তরাজ্যে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ থেকে কমে ২১ শতাংশে নেমে এলেও, ‘চরম দারিদ্র্য’ বা অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, দেশটিতে বর্তমানে যারা দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত, তাদের প্রায় অর্ধেকই চরম অভাবের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যারা
জেআরএফ-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পড়েনি। বিশেষ কিছু জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব ধ্বংসাত্মক।

১. বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি সম্প্রদায়: প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানি কমিউনিটিতে দারিদ্র্যের হার অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। এই দুই সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো আয়ের দিক থেকে মূলধারার শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
২. প্রতিবন্ধী ব্যক্তি: যারা শারীরিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, তাদের মধ্যে দারিদ্র্যের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
৩. শিশু: বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অশনিসংকেত।

সরকারি পদক্ষেপ ও নীতি পরিবর্তন
টানা তিন বছর ধরে শিশুদারিদ্র্য বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকার কিছু নীতিমালার পরিবর্তন এনেছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস ঘোষণা করেছেন যে, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে কল্যাণসুবিধার (Welfare Benefit) ওপর আরোপিত বিতর্কিত ‘দুই সন্তানের সীমা’ (Two-child limit) বাতিল করা হবে।

২০১৭ সালে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার এই নিয়ম চালু করেছিল, যার ফলে কোনো পরিবারে তৃতীয় বা তার পরবর্তী সন্তান জন্ম নিলে তাদের জন্য অতিরিক্ত কোনো সরকারি ভাতা দেওয়া হতো না। এই নিয়মটি স্বল্প আয়ের এবং বড় পরিবারগুলোর (বিশেষ করে এশীয় বংশোদ্ভূত) ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

সরকার আশা করছে, এই নিয়ম বাতিলের ফলে শিশুদারিদ্র্য কিছুটা কমবে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে আনুমানিক ৩১০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন সরকারের ‘দুই সন্তান নীতি’ বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করে বলেছে, শুধুমাত্র এই একটি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। জেআরএফ-এর মতে, সরকার যদি দারিদ্র্য বিমোচনে বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ না করে, তবে বর্তমান অগ্রগতি থমকে যেতে পারে।

দাতব্য সংস্থা ‘বিগ ইস্যু’-এর প্রতিষ্ঠাতা জন বার্ড এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে ‘সমাজের জন্য অত্যন্ত খারাপ সংবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, ধনী দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের এই চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সামগ্রিকভাবে, আবাসন সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং আয়ের স্থবিরতা মিলে যুক্তরাজ্যের নিম্ন আয়ের মানুষদের, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি কমিউনিটিকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts