আন্তর্জাতিক আইন এবং সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তিকে কার্যত অগ্রাহ্য করে অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পথে প্রথম ধাপ পার করলো দেশটির পার্লামেন্ট, নেসেট। সংযুক্তি সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত বিলের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে তারা, যা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এক নতুন ও গভীর টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে।
নেসেটে এই বিলটি ২৫-২৪ ভোটের এক অবিশ্বাস্য রকম সূক্ষ্ম ব্যবধানে পাস হয়, যা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিভাজনের চিত্র তুলে ধরেছে। আইন হিসেবে চূড়ান্ত হতে বিলটিকে আরও তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। তবে এই প্রাথমিক অনুমোদনকেই মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন অস্থিতিশীলতার অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান
এই বিল পাসের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, “পশ্চিম তীর নিয়ে তারা যেন কোনো পদক্ষেপ না নেয়।” ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও এই আইন প্রণয়নের প্রচেষ্টাকে ‘শান্তি পরিকল্পনার জন্য হুমকি’ এবং ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরিপন্থী’ বলে কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন।
তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো “বৃহত্তর ইসরায়েল” গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই বিল পাসের জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। তাদের কাছে, এই সংযুক্তি ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার একটি জরুরি পদক্ষেপ।
ক্ষমতা ও পরিণতির হিসাব-নিকাশ
প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি ‘না’ বলার পরেও কি ইসরায়েল একতরফাভাবে এই সংযুক্তি সম্পন্ন করতে পারে?
তাত্ত্বিকভাবে, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নিজস্ব আইন পাসের ক্ষেত্রে স্বাধীন। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়াই তারা এই বিল পাস করার ক্ষমতা রাখে। তবে এর বাস্তব এবং কূটনৈতিক পরিণতি হবে মারাত্মক। এমন পদক্ষেপ নিলে:
১. আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা: ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করার এই প্রচেষ্টা ইসরায়েলকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করে ফেলতে পারে।
২. সংঘাতের ঝুঁকি: এই পদক্ষেপের ফলে ফিলিস্তিনসহ পুরো আরব বিশ্বে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে ফাটল: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের কয়েক দশকের কৌশলগত মিত্রতার সম্পর্কে একটি বড় ধরনের ফাটল তৈরি করবে, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা এক্ষেত্রে একটি আনুষ্ঠানিক ‘ভেটো’ না হলেও, এটি একটি শক্তিশালী ‘প্রতিরোধক’ হিসেবে কাজ করে। ইসরায়েল এই বিল পাস করার দুঃসাহস দেখালেও এর জন্য যে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত মূল্য দিতে হবে, তা দেশটির জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
সুতরাং, নেসেটের এই ভোট কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া খেলার সামিল। এই বিলের চূড়ান্ত ভাগ্য এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, তবে এরই মধ্যে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
Analysis | Habibur Rahman


