১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩৮ বৃহস্পতিবার শীতকাল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক ভিন্নমাত্রার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাপ, অন্যদিকে প্রায় দেড় দশক পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের হাতছানি। তবে এবারের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে প্রথাগত মিছিল-মিটিংয়ের চেয়েও বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন। প্রায় ৫ কোটি তরুণ ভোটার, যারা মূলত ‘ডিজিটাল জেনারেশন’ হিসেবে পরিচিত, তাঁদের মন জয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখন রাজপথের চেয়ে সাইবার জগতেই বেশি সক্রিয়। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পোস্টার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এই ডিজিটাল যুদ্ধ বা ‘কনটেন্ট ওয়ার’-কে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
নতুন ভোটার: সংখ্যাতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে ২০০৮ সালের পর নতুন ভোটার হয়েছেন ৪ কোটি ৬৬ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় সাড়ে ৩৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সসীমার ভোটারদের তরুণ হিসেবে গণ্য করলে বাংলাদেশে এই সংখ্যা ৫ কোটির ঘর স্পর্শ করে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই তাঁদের জীবনে কখনো সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে রয়েছে। ফলে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচনে তাঁরা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উদগ্রীব হয়ে আছেন।
মিম, রিলস এবং ইনফ্লুয়েন্সার: প্রচারণার নতুন হাতিয়ার
পশ্চিমা বিশ্বের নির্বাচনী হাওয়া এখন বাংলাদেশেও বইছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনে তরুণ মুসলিম প্রার্থী জোহরান মামদানির জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল টিকটক ও সোশ্যাল মিডিয়া। সেই আদলে বাংলাদেশের দলগুলোও এখন ‘শর্ট ভিডিও’, ‘রিলস’ এবং ‘মিম’ কালচারের ওপর নির্ভর করছে।
প্রথাগত গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে ব্যাঙ্গাত্মক মিম কিংবা ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও বার্তা তরুণদের বেশি আকৃষ্ট করছে। দেশি-বিদেশি জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সাররা বিভিন্ন দলের হয়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রচারণায় নেমেছেন। একেকজন ইনফ্লুয়েন্সারের লাখ লাখ অনুসারী থাকায় তাঁদের প্রতিটি পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তেই জনমত গঠনে বড় প্রভাবক হয়ে উঠছে।
দলগুলোর ডিজিটাল কৌশল ও বয়ানের লড়াই
নির্বাচনের মাঠে দলগুলোর কৌশল এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। সোশ্যাল মিডিয়ায় আধিপত্য বিস্তারে কে কার চেয়ে এগিয়ে, তা নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
- বিএনপি: দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার তরুণদের টানতে স্লোগান দিয়েছে—‘তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের পক্ষে হোক’। দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ৪৭ লাখ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পেজে ৫৫ লাখ অনুসারী রয়েছেন। বিএনপি মূলত কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ক্ষমতায় গেলে ১ কোটি কর্মসংস্থান তৈরির ঘোষণা দিয়ে তারা তরুণদের ভবিষৎ নিশ্চিতের বার্তা দিচ্ছে। পাশাপাশি, জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা এবং দেশ পরিচালনায় অনভিজ্ঞতার বিষয়টি সামনে এনে নেতিবাচক প্রচারণা বা ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বিএনপি।
- জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোট: জামায়াত এবার কৌশলগতভাবে অনেকটাই নবীনমুখী। তাদের প্রার্থীদের ৭০-৮০ শতাংশই যুবক এবং দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৫০-এর নিচে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্যকে পুঁজি করে তারা তরুণদের আস্থা অর্জন করতে চায়। ফেসবুকে দলটির ৩০ লাখ ও আমিরের ২২ লাখ অনুসারী রয়েছে। বাঁশেরকেল্লাসহ বিভিন্ন পেজ থেকে তারা প্রচার চালাচ্ছে—‘বড় দুই দলকে তো দেখলেন, এবার আমাদের দেখুন’। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কদের নিয়ে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-এর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা জামায়াতের ভোটব্যাংকে তরুণদের যুক্ত করার একটি বড় কৌশল।
- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের এই দলটি সম্পূর্ণ নতুন ধারার রাজনীতির প্রবর্তন করতে চাইছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ফেসবুকে ১৪ লাখ অনুসারী। এনসিপির প্রার্থীরা নিজেদের স্বচ্ছতা ও সংস্কারের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের মতে, এবারের নির্বাচনে ৬০ শতাংশেরও বেশি ভোট তরুণদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তারাই ফল নির্ধারণ করবেন।
ক্রাউডফান্ডিং: নির্বাচনী ব্যয়ের নতুন সংস্কৃতি
এবারের নির্বাচনের অন্যতম চমক হলো নির্বাচনী তহবিলের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ক্রাউডফান্ডিং’ বা গণতহবিল সংগ্রহ। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া ডা. তাসনিম জারা ফেসবুকে অনুদানের আহ্বান জানানোর মাত্র ২৯ ঘণ্টার মধ্যে ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছেন। একইভাবে ‘আমার বাংলাদেশ’ (এবি) পার্টির আসাদুজ্জামান ফুয়াদও ফেসবুকে আহ্বানের মাধ্যমে প্রায় ৪০ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছেন। তরুণ ভোটাররা যে পরিবর্তনের রাজনীতিতে অর্থ দিয়েও শরিক হতে চান, এটি তার বড় প্রমাণ।
চ্যালেঞ্জ: অপতথ্য ও ভুয়া খবর
ডিজিটাল প্রচারণার ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক দিকও প্রবল হয়ে উঠছে। এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বিকৃত ভিডিওর ব্যবহার বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাইবার উইংগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়াচ্ছে, যা তরুণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
মিডিয়া বিশ্লেষক অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যেমন কম খরচে মামদানির মতো প্রার্থীদের জয়ী করা সম্ভব, তেমনি অপতথ্যের স্রোতে সত্য হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও থাকে। তাই তরুণ ভোটারদের সঠিক তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা এবারের নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উপসংহার
জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল বৈষম্যহীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থান। তরুণ ভোটাররা এবার প্রার্থীদের বিচার করবেন এই তিন মানদণ্ডে। পোস্টারবিহীন এই নির্বাচনে যাদের ‘ডিজিটাল ন্যারেটিভ’ বা বয়ান তরুণদের মন ছুঁতে পারবে, ব্যালট বাক্সে বিজয়ীর হাসি তাদের মুখেই ফুটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Analysis | Habibur Rahman
