১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৪৬ বুধবার বসন্তকাল
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিনে গত ৭ ডিসেম্বর (২০২৫) সংঘটিত একটি সেনা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা নাটকীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটির ন্যাশনাল গার্ডের একাংশের নেতৃত্বে হওয়া এই বিদ্রোহ নাইজেরিয়ার বিমান বাহিনীর সহায়তায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দমন করা সম্ভব হয়। বর্তমানে বেনিনের পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও, এই ঘটনা পুরো পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
৭ ডিসেম্বর সকালে বেনিনের রাজধানী কোতোনৌতে বিদ্রোহের সূচনা করেন ন্যাশনাল গার্ডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল প্যাসকাল টিগ্রি। তার নেতৃত্বে বিদ্রোহী সেনাদের একটি দল দেশটির সেনাপ্রধান ও সামরিক মন্ত্রিপরিষদের পরিচালকের বাসভবনে হামলা চালায়। এরপর তারা জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘এসআরটিবি’ (SRTB) দখল করে নেয় এবং টেলিভিশনে ঘোষণা দেয় যে, প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস ট্যালনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।
নিজেদের ‘মিলিটারি কমিটি ফর রিফাউন্ডেশন’ বা পুনর্গঠন কমিটি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিদ্রোহীরা সরকার ও সংবিধান বিলুপ্তির ঘোষণা দেয়। তবে তাদের এই উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
নাইজেরিয়ার বিমান হামলা ও বিদ্রোহ দমন
বিদ্রোহ দমনে বেনিনের অনুগত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ নাইজেরিয়া এবং আঞ্চলিক জোট ইকোওয়াস (ECOWAS) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নাইজেরিয়ার পাঠানো যুদ্ধবিমান থেকে বিদ্রোহীদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। এই হামলায় টিকতে না পেরে বিদ্রোহীরা টেলিভিশন স্টেশন এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
বেনিনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলাসানে সেদু দুপুরের মধ্যেই ঘোষণা করেন যে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাটি ‘নস্যাৎ’ করা হয়েছে। বিকেলের দিকে আইভরি কোস্ট এবং নাইজেরিয়ার সৈন্যরা ইকোওয়াসের স্ট্যান্ডবাই ফোর্সের অংশ হিসেবে বেনিনে প্রবেশ করে। দিনশেষে প্রেসিডেন্ট ট্যালন টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে জানান, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং এই ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
প্যাসকাল টিগ্রির পলায়ন ও ধরপাকড়
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর থেকে বেনিনে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১২ জন সক্রিয় সেনাসদস্যসহ অন্তত ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মূল হোতা লে. কর্নেল প্যাসকাল টিগ্রি এবং তার কয়েকজন সহযোগী সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ টোগোতে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেনিন সরকার টোগোর কাছে টিগ্রিকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে।
সরকার একে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বললেও, এর পেছনে কোনো বিদেশী শক্তির হাত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকায় নতুন শঙ্কা
বেনিনকে এতদিন পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নিজারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে সাম্প্রতিক সামরিক শাসনের উত্থান এবং উত্তরাঞ্চলে জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান তৎপরতা বেনিনের সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অভ্যুত্থান সফল হলে বেনিন হয়তো ‘সাহেল অ্যালায়েন্স’ (AES)-এ যোগ দিত, যা ইকোওয়াসের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারত। নাইজেরিয়ার এই তড়িৎ হস্তক্ষেপ সাংবিধানিক শাসন রক্ষার ক্ষেত্রে ইকোওয়াসের সক্ষমতা প্রমাণ করলেও, ২০২৬ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিতব্য বেনিনের নির্বাচনের আগে এই ঘটনা গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতাকেই নির্দেশ করছে।
আপাতত কোতোনৌয়ের জনজীবন স্বাভাবিক হলেও, সীমান্তজুড়ে চলছে কড়া নজরদারি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির দাবার চালে বেনিন এখন এক নতুন এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
Analysis | Habibur Rahman


