১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতি হিসেবে আমরা আর বিভাজন চাই না, আমাদের লক্ষ্য একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে এমন এক সমাজ আমরা গড়তে চাই, যেখানে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাদের কোনো স্থান থাকবে না। আল্লাহ যদি সহায় হন এবং জনগণ যদি ব্যালটের মাধ্যমে আমাদের নির্বাচিত করেন, তবে আগামীতে সবাইকে সাথে নিয়েই দেশ পরিচালনা করা হবে।

শনিবার (বগুড়া) দুপুরে শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত ১০ দলীয় ঐক্যের এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উন্নয়ন ও বগুড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এই জনপদ শিক্ষা ও শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বগুড়া জেলাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করা হবে। এছাড়া দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘুচিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে এখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব উন্নয়ন কোনো দয়ার দান নয় বরং জনগণের করের টাকায় তাদের অধিকার হিসেবেই বাস্তবায়ন করা হবে।
পাচারকৃত অর্থ ও অর্থনীতি
বিগত সরকারের আমলে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, গত দেড় দশকে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। জনগণের কষ্টার্জিত এই অর্থ যেন ঝুড়ির তলা না থাকায় হারিয়ে গেছে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে পাচারকৃত সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং তা জনকল্যাণে ব্যয় করা হবে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রকে সুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির পথ চিরতরে বন্ধ করার ঘোষণা দেন তিনি।
চাঁদাবাজি ও দ্রব্যমূল্য
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার জন্য চাঁদাবাজিকে দায়ী করে তিনি বলেন, পথে পথে চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যার ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। জুলাই বিপ্লবে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়া আমাদের অঙ্গীকার। তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী অতীতেও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির চর্চা করেছে, শত নির্যাতনের পরেও দলের কোনো নেতাকর্মী চাঁদাবাজিতে জড়ায়নি। এই পরিচ্ছন্ন হাতেই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
নারী নিরাপত্তা ও যুবসমাজ
নারীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, মা-বোনের ইজ্জতের মূল্য আমাদের কাছে জীবনের চেয়েও বেশি। দেশে কোনো লম্পটের ঠাঁই হবে না। নারীরা যাতে ঘরে-বাইরে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন এবং দেশগড়ায় ভূমিকা রাখতে পারেন, তা নিশ্চিত করা হবে।
যুবকদের কর্মসংস্থান নিয়ে তিনি বলেন, আমরা বেকার ভাতা দিয়ে তরুণদের অপমানিত করতে চাই না, এতে জাতি অলস হয়ে পড়ে। আমাদের লক্ষ্য হলো, শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তারা দেশ ও বিদেশে সম্মানের সাথে কর্মসংস্থান করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
পরবর্তীতে শেরপুরের মহিপুর খেলার মাঠে অপর এক জনসভায় যোগ দিয়ে শফিকুর রহমান পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু কারো প্রভুত্ব মেনে নেব না। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এদেশের ছাত্র-জনতা আধিপত্যবাদকে স্থায়ীভাবে ‘লাল কার্ড’ দেখিয়েছে।
বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে অর্থের বিনিময়ে বিচার বিক্রি বন্ধ হবে। বিচারক হবেন সম্পূর্ণ স্বাধীন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ও মজলুমই ন্যায়বিচার পাবেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো’ বলার সৎ সাহস রাখতে হবে। আমরা যদি ভুল করি, তবে তা ধরিয়ে দেবেন, কিন্তু সত্য গোপন করবেন না।
জনসভা শেষে তিনি বগুড়ার বিভিন্ন সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন। সমাবেশে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
Analysis | Habibur Rahman