১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১২:০৯ সোমবার বসন্তকাল
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করছিল, তখন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ফ্রেমে অনুপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী। বিজয়ের ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এই অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন থামেনি। কেন জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিলে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের বদলে স্বাক্ষর করেছিলেন ভারতীয় বাহিনীর কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা? বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল বিজয়ের শুরু থেকেই বাংলাদেশের ওপর ভারতের আধিপত্য বিস্তারের এক সুগভীর পরিকল্পনা।

জন্ম: ১ সেপ্টেম্বর ১৯১৮
জন্মস্থান: সুনামগঞ্জ, সিলেট (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু: ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪
সমাধি: সিলেট
ঐতিহাসিক দলিল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আত্মসমর্পণের দলিলে মোট তিনটি অনুচ্ছেদ ছিল। অত্যন্ত কৌশলে এই দলিলে ‘মুক্তিবাহিনী’ বা ‘মিত্রবাহিনী’র পরিবর্তে লেখা হয়েছিল যে, পাকিস্তানি বাহিনী ‘ভারতীয় বাহিনী’র কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করা হয় যে, আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ড সরাসরি ভারতীয় লেফট্যানেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার একক কমান্ডের আওতায় চলে যাবে। অথচ যৌক্তিকভাবে এটি ‘যৌথবাহিনী’ বা ‘মুক্তিবাহিনী’র নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল ওসমানী এই ভারতীয় নকশা ও কৌশল আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো তাকে সেই মঞ্চ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
মেজর ডালিমের লেখা বই এবং সমসাময়িক সেনা কর্মকর্তাদের বয়ান অনুযায়ী, জেনারেল ওসমানী ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং প্রবাসী সরকারের একাংশের অতিমাত্রায় ভারত-নির্ভরতা ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের বিরোধী ছিলেন। তার এই আপসহীন মনোভাবের কারণেই হয়তো ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা তাকে বিজয়ের মূল মঞ্চে দেখতে চাননি। তার পরিবর্তে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, যার উপস্থিতি ছিল অনেকটা নামমাত্র এবং এক কোণায়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সিনেমার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সৃষ্টিকে ভারতের দান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি পোস্টে ১৬ই ডিসেম্বরকে ভারতের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করা সেই দাবিরই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরেও গত ১৬ বছরে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব একটি নির্দিষ্ট দল ও ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

“Protesting strongly. December 16, 1971, was the day of victory for Bangladesh. India was the ally of this victory, nothing more,” condemned Dr Asif Nazrul, an advisor to Bangladesh’s interim government, and a professor at Dhaka University.
প্রোটোকলের দোহাই দিয়ে বলা হয়, যেহেতু পাকিস্তান ও ভারতের সেনাপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন না, তাই জেনারেল ওসমানীও উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দলিলে ভারতের একতরফা কর্তৃত্ব স্থাপনের বিষয়টি এই যুক্তিকে ধোপে টিকতে দেয় না। জেনারেল ওসমানী, যিনি তার শেষ সম্বলটুকুও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের জন্য দান করে গেছেন, তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার বা তার অবদানকে খাটো করার যে চেষ্টা হয়েছে, তা ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস।
Analysis | Habibur Rahman


