১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:৩৬ সোমবার বসন্তকাল
ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) মো. সেলিম রেজার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে তাঁর আদালত বর্জন করেছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। আইনজীবীদের এই আকস্মিক কর্মসূচির ফলে বুধবার (আজ) সকাল থেকে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত বিচারপ্রার্থী।
বুধবার সকাল ১০টা থেকে আইনজীবীরা এই বর্জন কর্মসূচি শুরু করেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিচারকের আচরণ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য এই এজলাস বর্জন অব্যাহত থাকবে।

আদালত প্রাঙ্গণের চিত্র ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি
সরেজমিনে আদালত প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিচারপ্রার্থীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। তবে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে বিচারক উপস্থিত থাকলেও আইনজীবীরা কেউ এজলাসে যাননি। ফলে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে অনেককে ফিরে যেতে দেখা যায়। জামিন শুনানি, হাজিরা এবং মামলার অন্যান্য জরুরি কার্যক্রমে অংশ নিতে না পেরে বিচারপ্রার্থীরা ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
আইনজীবীদের অভিযোগের পাহাড়
জেলা আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সিজেএম সেলিম রেজার বিরুদ্ধে অসদাচরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছেন অন্তত ১৪ জন আইনজীবী। তাঁদের মূল অভিযোগগুলো হলো:
১. সৌজন্যতাবোধের অভাব: ফরিদপুরে যোগদানের পর প্রথা অনুযায়ী আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো মতবিনিময় সভা করেননি এই বিচারক। আইনজীবীদের অভিযোগ, এজলাসে তিনি আইনজীবী ও মক্কেলদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত রূঢ় আচরণ করেন।
২. অলিখিত নিষেধাজ্ঞা: মামলার তারিখে আদালতে হাজির হওয়া আসামিদের সঙ্গে আইনজীবীদের কথা বলার ওপর তিনি অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। বিচারকের অনুমতি ছাড়া মক্কেলের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না, যা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করছে।
৩. ওকালতনামা প্রদানে জটিলতা: কারাগারে থাকা আসামিদের ওকালতনামা পাঠানোর দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মেও তিনি পরিবর্তন এনেছেন। আগে আইনজীবীর সহকারী বা মুহুরিরা ওকালতনামা জমা দিতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান সিজেএমের নির্দেশে এখন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে স্বয়ং বিচারকের কাছে আবেদন করে অনুমতি নিতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ ও হয়রানিমূলক।
৪. সনদ বাতিলের হুমকি: ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা জানান, সামান্য কারণে বিচারক আইনজীবীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন এবং ভর্ৎসনা করেন। এমনকি তিনি আইনজীবীদের বার কাউন্সিলের সনদ বাতিল করে দেওয়ারও হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জরুরি সভার সিদ্ধান্ত
আইনজীবীদের ক্রমাগত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে এক জরুরি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে সিজেএম সেলিম রেজার আদালত অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পাশাপাশি, বিচারকের অসদাচরণের বিষয়টি লিখিত আকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিমউদ্দিন মৃধা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সিজেএম আদালতের নানাবিধ নতুন ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত এবং আইনজীবীদের প্রতি ধারাবাহিক অবজ্ঞার কারণে আমরা ক্ষুব্ধ। বিচারক প্রতিনিয়ত আইনজীবীদের নাজেহাল করছেন। আত্মসম্মান ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষার্থেই আমরা তাঁর এজলাস বর্জনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।”
আইনজীবীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সম্মানজনক সমাধান ও বিচারকের আচরণের পরিবর্তন না হলে তাঁরা কাজে ফিরবেন না। ফলে আদালতের এই অচলাবস্থা কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
Analysis | Habibur Rahman