১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
নির্বাচনী প্রচারণায় দলের নারী কর্মীদের বাধা প্রদান এবং হয়রানির অভিযোগ তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, জামায়াত নিজে থেকে গায়ে পড়ে বিবাদে জড়াবে না, কিন্তু শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে কিংবা গায়ে হাত তুললে তা প্রতিহত করা হবে। একইসঙ্গে তিনি দেশের রাজনীতি থেকে পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে মেধা ও ইনসাফভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
গত মঙ্গলবার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি জেলা—যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত পৃথক চারটি নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘মায়ের জাতিকে অপমান বরদাশত করা হবে না’
যশোর ঈদগাহ ময়দানের জনসভায় নির্বাচনী প্রচারণার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে তাদের নারী কর্মীদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের, কিন্তু দলীয় কর্মীদের গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই।
তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও যুবসমাজের উদ্দেশে বলেন, “আমরা কারোর পায়ে পা দিয়ে ঝামেলা করতে চাই না। কিন্তু আমাদের কর্মসূচিতে বাধা আসলে কিংবা আমাদের মা-বোনদের অসম্মান করা হলে তা বরদাশত করা হবে না। যেখানেই বাধা আসবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
‘বন্ধু দলের’ প্রতি শৃঙ্খলা ফেরানোর আহ্বান
নাম উল্লেখ না করে বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, একটি বন্ধুপ্রতীক দল একদিকে মায়েদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিচ্ছে, অন্যদিকে তাদের কর্মীরাই নারীদের গায়ে হাত তুলছে—যা দ্বিচারিতা। তিনি মন্তব্য করেন, “যারা নিজেদের দলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তারা দেশ পরিচালনা করবে কীভাবে?” প্রয়োজনে দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ‘কান ধরে’ বিচার করার হুঁশিয়ারি
বাগেরহাটের হযরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজার-সংলগ্ন মাঠের জনসভায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন শফিকুর রহমান। ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুণ্ঠনকারীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, কেবল চুনোপুঁটিদের (লেজ) ধরা হবে না, বরং রাঘববোয়ালদের কান ধরে আইনের আওতায় আনা হবে। যারা জনগণের টাকা লুটে বিদেশে আলিশান জীবন যাপন করছে, তাদের ‘পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে’ সেই টাকা বের করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
বেকার ভাতা নয়, কর্মসংস্থান ও সম্মান
খুলনা সার্কিট হাউস মাঠের জনসভায় তরুণ সমাজের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে তরুণরা যে বিজয় এনে দিয়েছে, তার ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “আমরা তরুণদের হাতে বেকার ভাতার নামে ভিক্ষা তুলে দিয়ে অপমান করতে চাই না। বরং প্রতিটি হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করে তাদের স্বাবলম্বী ও সম্মানিত নাগরিক হিসেবে গড়তে চাই।”
পরিবারতন্ত্র ও বস্তাপচা রাজনীতির অবসান
সাতক্ষীরা সরকারি বিদ্যালয় মাঠের সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ এখন পরিবর্তনের পক্ষে। তারা ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের সমাজ চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অতীতের ‘বস্তাপচা’ ও ‘পরিবারতন্ত্রনির্ভর’ রাজনীতির দিন শেষ। জামায়াত কেবল দলীয় বিজয় চায় না, বরং দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় নিশ্চিত করতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন, আল্লাহ সুযোগ দিলে কোনো শিক্ষিত চোরকে আর জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করতে দেওয়া হবে না।
নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রশাসনের ভূমিকা
নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “শীতের (মাঘ) মাসেই যদি মাথা গরম হয়ে যায়, তবে চৈত্র মাসে কী হবে?” প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থেকে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে আজাদি আর ‘না’ ভোট মানে গোলামি।
দিনব্যাপী এই জনসভাগুলোতে সভাপতিত্ব করেন সংশ্লিষ্ট জেলার জামায়াত আমিরের। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলামসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতারা। সভাগুলোতে জামায়াত আমির জোট মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।