.
খেলা

বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্ধকার দিক! জাহানারা আলমের সাহসিকতায় কি বদলাবে বিসিবি?

Email :43

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:৩৬ সোমবার বসন্তকাল

ক্রিকেটের বাইশ গজে তিনি এক নির্ভীক যোদ্ধা। তার গতির ঝড়ে বহুবার পরাস্ত হয়েছে প্রতিপক্ষ। কিন্তু এবার জাহানারা আলম যে লড়াইয়ে নেমেছেন, তার মাঠ বাইশ গজ নয়; বরং এটি এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে প্রতিপক্ষ তারই প্রতিষ্ঠানের অংশ। জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়কের তোলা যৌন হয়রানির অভিযোগ কেবল একটি ব্যক্তিগত আর্তনাদ নয়, এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের চকচকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার বাস্তবতাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই অভিযোগ একাধারে সাহসের প্রতীক এবং পুরো ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।

অভিযোগের আড়ালের গভীর ক্ষত
জাহানারা আলমের অভিযোগের বিবরণ কেবল কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের তালিকা নয়, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারী ক্রীড়াবিদদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির এক করুণ চিত্র। বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে, যখন একজন খেলোয়াড়ের সমস্ত মনোযোগ থাকার কথা খেলার মাঠে, তখন তাকে দলেরই নির্বাচক ও কর্মকর্তার কাছ থেকে “অশালীন আচরণ” ও “অনুপযুক্ত প্রশ্নের” মুখোমুখি হতে হয়েছে। “মাসিক চক্র” নিয়ে অশালীন মন্তব্যের মতো বিষয় প্রমাণ করে, এটি কেবল নিছক ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং নারী হিসেবে একজন খেলোয়াড়ের আত্মসম্মান এবং ব্যক্তিগত গণ্ডিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক বিকৃত প্রচেষ্টা। এটি এমন এক মানসিক নির্যাতন, যা মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও গভীরে গিয়ে একজন খেলোয়াড়কে ভেঙে দিতে পারে।

বিসিবির দ্রুত পদক্ষেপ ও আস্থার সংকট
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে যে বার্তা দিয়েছে, তা প্রশংসার যোগ্য। ‘শূন্য সহনশীলতার’ প্রতিশ্রুতিও কানে আশার বাণী শোনায়। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত অনেক সময়ই কালক্ষেপণ এবং জনরোষ ঠাণ্ডা করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই বিসিবির আসল পরীক্ষা এখন শুরু। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে যে রিপোর্ট আসবে, তা কতটা স্বচ্ছ, কতটা নিরপেক্ষ এবং তার ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপ কতটা কঠোর হবে—তার উপরই নির্ভর করছে নারী ক্রিকেটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি।

একজনের সাহস যখন অনেকের কণ্ঠস্বর
বিদেশে প্রশিক্ষণে থাকা জাহানারা জানিয়েছেন, তার এই পদক্ষেপ কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার লড়াই। তার এই একটি কণ্ঠস্বর যেন মুহূর্তেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে বিশ্বজুড়ে। ভারত, পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের নারী ক্রিকেটাররা যখন #StandWithJahanara হ্যাশট্যাগে শামিল হন, তখন এটি আর নিছক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। এটি হয়ে ওঠে নারী ক্রীড়াবিদদের প্রতি বৈষম্য ও হয়রানির বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক প্রতিবাদ।

এই ঘটনা বিসিবিকে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বোর্ড কি কেবল কয়েকজন দোষী ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়েই দায় সারবে, নাকি এই সুযোগে একটি শক্তিশালী ‘খেলোয়াড় সুরক্ষা নীতি’ এবং অভিযোগ জানানোর একটি গোপন ও নিরাপদ চ্যানেল তৈরি করে একটি স্থায়ী সমাধান আনবে। জাহানারার এই সাহসী গর্জন কি ক্রিকেটের ভেতরের এই নীরব অন্ধকার দূর করতে পারবে, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ছায়ায় মিলিয়ে যাবে—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আগামী দিনের সত্যিকারের চরিত্র।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts