.
আন্তর্জাতিক

বরফের নিচে ট্রাম্পের ‘গুপ্তধন’: গ্রিনল্যান্ড কেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ

Email :14

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল

বিশ্ব মানচিত্রে বিশাল সাদা বরফের চাদরে ঢাকা দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। প্রকাশ্যে তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে দাবি করলেও, বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনের মূল কারণটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক। ট্রাম্প দাবি করেছেন, দ্বীপটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে একটি চুক্তির ‘কাঠামো’ তিনি প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল নিরাপত্তাই কি মূল লক্ষ্য, নাকি বরফের স্তরের নিচে লুকিয়ে থাকা ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদের ভান্ডারই আসল আকর্ষণ?

গ্রিনল্যান্ডফাইল ছবি: রয়টার্স

কী আছে গ্রিনল্যান্ডের গভীরে?
গ্রিনল্যান্ডকে বলা হচ্ছে ভবিষ্যতের খনিজ সম্পদের ‘সুপার পাওয়ার’। ২০২৩ সালে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ভূতাত্ত্বিক জরিপ (GEUS) এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে ২৫টিই গ্রিনল্যান্ডে মজুদ রয়েছে।

এর মধ্যে গ্রাফাইট, নিওবিয়াম, টাইটানিয়াম এবং বিভিন্ন বিরল মৃত্তিকা মৌল (Rare Earth Elements) অন্যতম। বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে এসব উপাদানের বিকল্প নেই। স্মার্টফোন, কম্পিউটার চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান এবং রাডার তৈরির মতো সামরিক প্রযুক্তিতে এসব খনিজ অপরিহার্য। এছাড়া ধারণা করা হয়, গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক বিশাল মজুদ এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

চীনের আধিপত্য খর্ব করার কৌশল
বিশ্ববাজারে বিরল খনিজ সম্পদের সরবরাহে বর্তমানে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সামরিক খাত চীনের এই সরবরাহের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড প্রীতির মূল কারণ হলো এই নির্ভরতা কমানো।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন ল্যামির মতে, ট্রাম্পের লক্ষ্য পরিষ্কার—খনিজ সম্পদের উৎসে চীনের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সাপ্লাই চেইন তৈরি করা। এরই অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন গত গ্রীষ্মে গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন খনি প্রকল্পে ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছিল।

‘নিরাপত্তা’ বনাম ‘বাণিজ্য’
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। লুইজিয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে একটি বিশাল বাণিজ্যিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। যদিও প্রকাশ্যে দাভোসের সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেছেন, “আমি শুধু নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড চাই, অন্য কিছুর জন্য নয়।”

তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা এবং রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের মতো নেতারা ভিন্ন সুর গাইছেন। ক্রুজের মতে, গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব কেবল প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, সেখানকার বিরল খনিজ ভান্ডার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। লন্ডনভিত্তিক চ্যাথাম হাউসের গবেষক প্যাট্রিক শ্রডারের মতে, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে।

বরফ গলার সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ দ্রুত গলছে। পরিবেশবাদীদের জন্য এটি দুঃসংবাদ হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখছে। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন সমুদ্রপথ উন্মোচিত হচ্ছে এবং খনিজ উত্তোলন তুলনামূলক সহজ হয়ে আসছে। এছাড়া সেখানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

তবে বাস্তবতা সবসময় এত সহজ নয়। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, খনিজ সম্পদ আহরণে প্রায় ২৫ ফুট বরফের স্তর ভেদ করতে হবে, যা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেন সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে খনি পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রতিকূল আবহাওয়া, অবকাঠামোর অভাব এবং দক্ষ শ্রমিকের সংকট সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অতীতে গ্রিনল্যান্ড বিদেশি বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করেও উচ্চ খরচের কারণে খুব একটা সফল হয়নি।

উপসংহার
ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের সামরিক উপস্থিতি মোকাবিলার কথা বলে ন্যুকে কনস্যুলেট খুলেছে এবং সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের ঘটনাপ্রবাহ নির্দেশ করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক আধিপত্য। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আর্কটিক ইনিশিয়েটিভের পরিচালক জেনিফার স্পেন্স যেমনটি বলেছেন, ট্রাম্প নিরাপত্তার কথা বললেও এর পেছনের মূল চালিকাশক্তি আসলে অর্থনীতি। গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে সুপ্ত খনিজ সম্পদই হয়তো আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ট্রাম্পকার্ড হতে যাচ্ছে। Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts