১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩২ সোমবার বসন্তকাল
ফরিদপুর শহরের বুকে রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র দ্বারা পরিচালিত একটি শক্তিশালী বোমা স্কুলব্যাগে লুকানো অবস্থায় উদ্ধার এবং সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করার ঘটনা শহরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আজ রোববার সকাল ঠিক ১০টায় ফরিদপুরের বিসর্জন ঘাট এলাকায় পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) একটি বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযানে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এটিকে সম্পূর্ণরূপে নিস্ক্রিয় করে। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা, তবে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ।

শ্বাসরুদ্ধকর নিষ্ক্রিয়করণ অভিযান:
সকাল থেকে ফরিদপুর শহরের বিসর্জন ঘাট এলাকার আলীপুর সেতুর দুই পাশ এবং কুমার নদের দুই পাড়ে মানুষের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় সেনাবাহিনী ও জেলা পুলিশের সদস্যরা। ঢাকা থেকে আগত ১০ সদস্যবিশিষ্ট এটিইউ’র বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের অভিযান শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা বোমাটির সঙ্গে বিশেষ তার যুক্ত করেন। এরপর প্রায় ৫০ মিটার দূরে একটি নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে ইলেকট্রিক সংযোগের মাধ্যমে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটান। মুহূর্তেই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বিকট শব্দে বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে বোমার স্প্লিন্টার মাটির ওপর থেকে অন্তত ২০ ফুট উচ্চতায় ছিটকে যায়। বিস্ফোরণের পরপরই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা, যা কয়েক মুহূর্তের জন্য উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
“এটি ছিল রিমোট কন্ট্রোল চালিত শক্তিশালী বোমা”:
বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের পরিদর্শক শংকর কুমার ঘোষ সাংবাদিকদের জানান, স্কুলব্যাগে স্কচটেপ মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া বস্তুটি ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র দ্বারা পরিচালিত বোমা। এর উপস্থিতি জনবহুল এলাকায় বড় ধরনের নাশকতা ঘটাতে পারতো। এটিইউ’র সফল অভিযানে একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
যেভাবে এলো বোমাটি:
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমির হোসেন ঘটনার বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জানান, গতকাল (শনিবার) দুপুরে আলীপুর সেতুর ওপর জমা করে রাখা খড়ির গাদার ভেতরে বোমা থাকার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী দ্রুত এলাকাটি ঘিরে ফেলে। তল্লাশি চালিয়ে একটি স্কুলব্যাগ উদ্ধার করা হয়, যার ভেতরে টেপ দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পেঁচানো একটি বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে এর ভয়াবহতা অনুধাবন করে নিরাপত্তার কারণে বস্তুটি দ্রুত সেতু এলাকা থেকে সরিয়ে কুমার নদের পাড়ে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বালুর বস্তা দিয়ে সুরক্ষিত একটি অস্থায়ী স্থানে এটিকে ঘিরে রাখা হয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) টিমের সহায়তা চাওয়া হয়। এটিইউ’র ১০ সদস্যের একটি বিশেষ দল গতকাল রাতেই ফরিদপুরে এসে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। দলের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আজ সকালে নিষ্ক্রিয়করণ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন।
তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু:
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এখন এটিইউ এবং স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে একটি নিবিড় তদন্ত শুরু করবে। কারা এই শক্তিশালী বোমাটি এখানে এনেছিল, এর পেছনে কি উদ্দেশ্য ছিল এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার পেছনে কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর যোগসাজশ আছে কিনা, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে।
ফরিদপুরের শান্ত পরিবেশে এমন একটি শক্তিশালী রিমোট কন্ট্রোল বোমার উপস্থিতি জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তবে প্রশাসনের দ্রুত ও সফল পদক্ষেপ একটি বড় বিপদ থেকে শহরকে রক্ষা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Analysis | Habibur Rahman