১০ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২৪শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি রাত ৩:২৯ মঙ্গলবার বসন্তকাল
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু বছরের পর বছর ধরে যে দাবি করে আসছিলেন, তা অবশেষে মিথ্যে প্রমাণিত হলো। ভার্জিনিয়া জিউফ্রের কোমরে হাত দিয়ে তোলা বহুল আলোচিত সেই ছবিটি যে ‘আসল’ এবং এতে কোনো কারসাজি করা হয়নি—তার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) থেকে প্রকাশিত জেফরি এপস্টেইনের নথিপত্রের একটি ই-মেইল বার্তায় এই সত্য উন্মোচিত হয়েছে।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর দাবি করে আসছিলেন যে, ভার্জিনিয়ার সঙ্গে তার কখনোই সাক্ষাৎ হয়নি এবং ওই ছবিটি ‘ফেইক’ বা কৃত্রিমভাবে তৈরি। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইনের সাবেক প্রেমিকা ও সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল নিজেই ছবিটির সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন।

কী আছে সেই গোপন ই-মেইলে?
২০১৫ সালে জেফরি এপস্টেইনের কাছে ‘ড্রাফট স্টেটমেন্ট’ বা খসড়া বিবৃতি শিরোনামে একটি ই-মেইল পাঠান গিলেন ম্যাক্সওয়েল। যদিও নথিতে প্রেরকের নামটি আংশিক গোপন রাখা হয়েছে, তবে বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এটি ম্যাক্সওয়েলেরই বার্তা।
ই-মেইলটিতে লেখা ছিল, “২০০১ সালে আমি যখন লন্ডনে ছিলাম, তখন (নাম অস্পষ্ট) আমার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন, যাদের মধ্যে প্রিন্স অ্যান্ড্রুও উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় একটি ছবি তোলা হয়েছিল। আমার ধারণা, তিনি ছবিটি তার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের দেখানোর উদ্দেশ্যেই তুলেছিলেন।”
এই বার্তাটি অ্যান্ড্রুর সেই দাবিকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ওই নির্দিষ্ট সময়ে তিনি লন্ডনের ওকিং এলাকার একটি পিজা রেস্তোরাঁয় ছিলেন, ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে নয়। এছাড়াও, ২০১১ সালের অন্য একটি ই-মেইলে জেফরি এপস্টেইন নিজেও লিখেছিলেন, “হ্যাঁ, তিনি (ভার্জিনিয়া) আমার উড়োজাহাজে ছিলেন এবং অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তার ছবি তোলা হয়েছিল।”
দেরিতে হলেও সত্যের জয়: ভার্জিনিয়ার পরিবারের প্রতিক্রিয়া
দুর্ভাগ্যবশত, নিজের দাবির এই স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেননি অভিযোগকারী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে। তিনি ২০২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তবে নতুন এই তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর বিবিসির ‘নিউজনাইট’ অনুষ্ঠানে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তার পরিবার।
ভার্জিনিয়ার ভাই স্কাই রবার্টস বলেন, “এই ই-মেইলটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে ভার্জিনিয়া কখনোই মিথ্যা বলেননি। আমাদের বোন আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার লড়াইয়ের সত্যতা আজ প্রমাণিত। আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত।”
ভার্জিনিয়ার ভাবি আমান্ডা রবার্টস জানান, তথাকথিত এপস্টেইন ফাইলস উন্মুক্ত হওয়া তাদের জন্য ঝড়ের মতো অভিজ্ঞতা। তিনি অশ্রুসজল চোখে বলেন, “আজকের এই দিনটি দেখার জন্য ভার্জিনিয়ার বেঁচে থাকা খুব প্রয়োজন ছিল। তিনি ছিলেন মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী একজন যোদ্ধা। আমরা তাকে ভীষণভাবে মিস করছি।”
রাজকীয় পতনের চূড়ান্ত অধ্যায়
২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিন্স অ্যান্ড্রু ছবিটির সত্যতা চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, “ছবিটি বিকৃত কি না তা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না, তবে আমার স্মৃতিতে এমন কোনো ছবি তোলার ঘটনা নেই।” তবে ২০২২ সালে ভার্জিনিয়ার সঙ্গে আদালতের বাইরে বিশাল অঙ্কের অর্থর বিনিময়ে (প্রায় ১৪০ কোটি টাকা) মামলা নিষ্পত্তি করেন তিনি, যদিও সেখানে তিনি কোনো দোষ স্বীকার করেননি।
সাম্প্রতিক নথিতে কেবল ছবির সত্যতাই নয়, অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এপস্টেইনের গভীর সখ্যের আরও প্রমাণ মিলেছে। জানা গেছে, অ্যান্ড্রু কুখ্যাত এই যৌন অপরাধীকে বাকিংহাম প্যালেসেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এসব কেলেঙ্কারির জেরে গত বছরের (২০২৫) অক্টোবর মাসে প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে তার রাজকীয় উপাধি থেকে চূড়ান্তভাবে বঞ্চিত করা হয় এবং রাজকীয় বাসভবন ‘রয়্যাল লজ’ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একসময়ের প্রভাবশালী এই রাজপুত্র এখন জনবিচ্ছিন্ন এবং কলঙ্কিত এক অধ্যায়ের নাম।
উল্লেখ্য, যৌন অপরাধে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টেইন ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করেন এবং তার সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল মানবপাচার ও যৌন নিপীড়নের দায়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। Analysis | Habibur Rahman