১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:৪১ সোমবার বসন্তকাল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, যা বরাবরই জ্ঞানচর্চা আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মুখর থাকে, সম্প্রতি তা পরিণত হয়েছে শৈল্পিক প্রতিবাদের এক অনন্য মঞ্চে। গিটারের সুরে আর সম্মিলিত কণ্ঠের গানে শিক্ষার্থীরা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেননি, বরং তুলে ধরেছেন এক গভীর উদ্বেগের কথা। তাঁদের প্রতিবাদের লক্ষ্য সরকারের একটি নতুন সিদ্ধান্ত—যা দেশের কোটি কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন থেকে সংগীত আর খেলাধুলার আনুষ্ঠানিক সুযোগ কেড়ে নিতে পারে।
এই বিক্ষোভের উৎস প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ৩ নভেম্বরের একটি প্রজ্ঞাপন। ওই প্রজ্ঞাপনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘সংগীত’ ও ‘শারীরিক শিক্ষা’ বিষয়ে সহকারী শিক্ষকের প্রস্তাবিত পদ দুটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশের বিদগ্ধ সমাজ ও ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে এক তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, যার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে।
শিক্ষার্থীরা কেবল স্লোগান বা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াননি, তাঁরা গান গেয়ে, সুর তুলে নিজেদের দাবিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল কয়েকটি চাকরির সুযোগ নষ্ট করা নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দর্শন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের মূলে একটি বড় আঘাত। একজন শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, “যে শিশু মাঠে দৌড়াতে শেখে না, যে কণ্ঠে সুর তুলতে জানে না, সে বইয়ের চাপে একজন রোবট হয়ে বেড়ে উঠবে। আমরা কি তেমন প্রজন্ম চাই?”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক আজিজুর রহমান তুহিনের কণ্ঠেও ঝরে পড়ে একই শঙ্কা। তিনি বলেন, “কোনো সভ্যতা তার দালানকোঠা দিয়ে টিকে থাকে না, টিকে থাকে তার শিল্প-সংস্কৃতি দিয়ে। প্রাথমিক স্তর থেকেই যদি এই চর্চার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে আমরা ধীরে ধীরে এক সাংস্কৃতিক দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাব।”
অন্যদিকে, মন্ত্রণালয় তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে যে, সীমিত পরিসরে এই পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দিলে দেশব্যাপী একটি বৈষম্য তৈরি হতে পারে এবং এর সুফল সব শিক্ষার্থীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে না। তাই সার্বিক কার্যকারিতা বিবেচনায় পদ দুটি বাতিল করা হয়েছে।
তবে মন্ত্রণালয়ের এই যুক্তিকে ‘প্রশাসনিক অজুহাত’ বলে মানতে নারাজ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ধারণা, বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চাপেই এমন একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সৃজনশীল ও সুস্থ জাতি গঠনের অন্তরায়।
দিনশেষে, এই বিতর্কটি এখন দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে রয়েছে প্রশাসনিক সমতা ও কার্যকারিতার প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে একটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য শিল্পকলা ও শারীরিক শিক্ষার অপরিহার্যতা। এই সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত পরিণতিই বলে দেবে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হবে, নাকি তাদের শৈশব সুর, ছন্দ আর খেলাধুলার আনন্দেও বর্ণিল হয়ে উঠবে।
Analysis | Habibur Rahman


